শিরোনাম

Space for ads

সিজার রোগী আনলে ২ হাজার, নরমালে এক হাজার টাকা কমিশন, তদন্ত কমিটি গঠন

 প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬, ০৫:১৮ অপরাহ্ন   |   চিকিৎসা

সিজার রোগী আনলে ২ হাজার, নরমালে এক হাজার টাকা কমিশন, তদন্ত কমিটি গঠন
Space for ads

ফেনীতে নার্স (সেবিকা) পরিচয় দিয়ে এক অন্তঃসত্ত্বাকে প্রসব করানোর চেষ্টা করতে গিয়ে গর্ভেই সন্তানের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত সেবিকাকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ৯টার দিকে শহরের শহীদ শহিদুল্লা কায়সার সড়কে ফেনী কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ওই নারী মৃত সন্তান প্রসব করেন।

এদিকে, শিশু মৃত্যুর খবর পেয়ে বুধবার (৬ মে) দুপুরে ৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছেন ফেনী সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ রুবাইয়াত বিন করিম। কমিটির সদস্যদের আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন প্রদান করতে বলা হয়েছে।

রোগীর স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দাগনভূঞার দরবেশেরহাট নোয়াদ্দা এলাকার বাসিন্দা মনির হোসেনের স্ত্রী রাজিয়া সুলতানার (২১) প্রসব বেদনা শুরু হয়। দুপুরে সদর উপজেলার জাহারপুরে ফেনী কেয়ার হাসপাতালের সিনিয়র নার্স পরিচয় দেয়া ছকিনা আক্তারকে রাজিয়া সুলতানার বাড়িতে ডাকা হয়। দিনভর ছকিনা নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। সন্ধ্যায় ইনজেকশন দেয়ার পর রাজিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ছকিনা দ্রুত তাকে ফেনী কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে আসেন। একপর্যায়ে রাজিয়া সেখানে মৃত সন্তান প্রসব করেন।

প্রসূতি রাজিয়ার স্বামী মনির হোসেন বলেন, ছকিনা আক্তার ভিজিটিং কার্ড দেখিয়ে নিজেকে ফেনী কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সিনিয়র নার্স পরিচয় দিয়েছিলেন। বাড়িতে স্বাভাবিক প্রসব করানোর চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হন। আমার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে তাকে ফেনী কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আনার পরেও হাসপাতালের লোকজন দীর্ঘ সময় দেরি করে। একপর্যায়ে হাসপাতাল থেকে জানানো হয় আমার সন্তান আর বেঁচে নেই।

তিনি বলেন, তখন সিনিয়র নার্স পরিচয় দেয়া ওই মহিলাকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চেনেন না বলে দাবি করেন। সর্বশেষ স্বীকার করেছেন ছকিনাকে দিয়ে তারা মার্কেটিংয়ের কাজ করাতেন। কিন্তু সিনিয়র সেবিকা সম্বলিত কার্ড দেয়ার বিষয়ে সঠিক কোনও উত্তর মেলেনি। তাদের অবহেলার কারণে আমার সন্তান দুনিয়ার আলো দেখার আগেই মৃত্যুবরণ করেছে। আমি এমন ঘটনার বিচার চাই।

জহিরুল ইসলাম পিয়াস নামে তাদের এক স্বজন বলেন, কখনো রোগীর বিনিময়ে কমিশন বাণিজ্য, আবার কখনো ভুল চিকিৎসা বা অবহেলা করে এসব হাসপাতাল-ক্লিনিক মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আমরা কার কাছে বিচার চাইব।

কামরুজ্জামান নিলয় নামে আরেক স্বজন বলেন, হাসপাতালে আনার বিলম্ব ও অব্যবস্থাপনার শিকার না হলে হয়তো শিশুটি বেঁচে যেত। এ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মাত্র এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকার কমিশনে গ্রামের দরিদ্র নারীদের সেবিকা পরিচয়ে কার্ড করে দিয়েছেন। কমিশন বাণিজ্যের মুখে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে এমন প্রতারণা কোনোভাবেই মেনে নেয়ার মতো না। এমন ঘটনার পরেও স্বাস্থ্য বিভাগের কেউ ঘটনাস্থলে আসেননি। আমরা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার চাই।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সেবিকা পরিচয় দেয়া ছকিনা আক্তার বলেন, আমাকে ফেনী কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে সিনিয়র সেবিকা পরিচয়ে ভিজিটিং কার্ড করে দিয়েছে। আমি নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। হাসপাতাল সিজার অপারেশনের ১৮ হাজার টাকা চুক্তির রোগী আনলে আমাকে ২ হাজার টাকা আর নরমাল ডেলিভারির রোগী প্রতি এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা দেয়। আজকে এখানে আসার পরে বেশি সময় নিয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসক, লোকজন আর জিনিসপত্রও ঠিকমতো ছিল না।

ফেনী কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দায়িত্বরত মেডিকেল অফিসার ডা. আবদুর রহমান বলেন, ওই প্রসূতিকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পর আমরা আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে গর্ভে থাকা শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। মৃত সন্তান প্রসবের সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলা বা এমন কিছুর অভিযোগ সঠিক নয়।

ফেনী কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক আলাউদ্দিন আলো বলেন, মূলত হাসপাতালের মার্কেটিংয়ের কাজের জন্য একটি শ্রেণি কাজ করে। কিন্তু তাদের সেবিকা বা সিনিয়র সেবিকা পরিচয় দিয়ে আমরা ভিজিটিং কার্ড সরাসরি তৈরি করে দেয়নি। সাত্তার নামে হাসপাতালে কর্মরত সাবেক এক ব্যক্তির মধ্যস্থতায় এমনটি হয়েছে। আমরা কখনো কোনও মানুষের প্রাণহানি বা চিকিৎসা ক্ষেত্রে অবহেলার মতো বিষয় চাই না।

ফেনী মডেল থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) সজল কান্তি দাশ বলেন, খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে পুলিশ সদস্যদের নিয়ে উপস্থিত হই। শিশুর মরদেহ ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত সেবিকা পরিচয় দেয়া নারীকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। অভিযোগ পেলে পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ফেনী সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ রুবাইয়াত বিন করিম বলেন, এক অন্তঃসত্ত্বাকে প্রসব করানোর চেষ্টা করতে গিয়ে গর্ভের সন্তানের মৃত্যু হয়েছে অভিযোগ শুনেছি। শিশু মৃত্যুর খবর পেয়ে ৩ সদস্যে বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন প্রদান করতে বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

BBS cable ad

চিকিৎসা এর আরও খবর: