Space for ads

অসহ্য গরমে ঝুঁকিতে শিশু-বয়স্করা, জরুরি সতর্কতা

 প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৯:২৪ পূর্বাহ্ন   |   চিকিৎসা

অসহ্য গরমে ঝুঁকিতে শিশু-বয়স্করা, জরুরি সতর্কতা
Space for ads

 

তাপপ্রবাহে হিটস্ট্রোকের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন বাড়ছে তেমনি অনিরাপদ পানি পানে বাড়ছে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবও/ ছবি: এআই
তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে দেশ। সেই সঙ্গে বাতাসে অস্বাভাবিক আর্দ্রতা যোগ হওয়ায় বেশিরভাগ সময়ই অনুভূত হচ্ছে অসহ্য গরম। চলমান তাপপ্রবাহের কারণে মানুষের মধ্যে পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, খিঁচুনি ও হিটস্ট্রোকের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি অনিরাপদ পানি পানের কারণে বাড়ছে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবও।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে হিটস্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। তীব্র গরমে শিশু, বয়স্ক, প্রসূতি, শ্রমজীবী ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
 
এমন পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ সতর্কতা ও তীব্র গরমের নানাবিধ জটিলতা এড়াতে একগুচ্ছ জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
 

আইসিডিডিআর,বি-এর তথ্য অনুযায়ী, পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা যখন ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়ে যায় এবং এই অবস্থা টানা দুদিনের বেশি স্থায়ী হয়, তখন সেই তাপপ্রবাহকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় তা মানবদেহের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা?
তীব্র এই গরমে কম-বেশি সবাই কষ্টের সম্মুখীন হলেও কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণি-পেশার মানুষ চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, নিচের জনগোষ্ঠীর জন্য এই সময়ে বাড়তি সুরক্ষার প্রয়োজন:

শ্রমজীবী মানুষ: যারা পেটের দায়ে বা কাজের প্রয়োজনে সরাসরি খোলা আকাশের নিচে দীর্ঘ সময় কাটান। বিশেষ করে রিকশা বা ভ্যানচালক, কৃষক ও নির্মাণশ্রমিকরা এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন।
 
সংবেদনশীল জনগোষ্ঠী: গর্ভবতী, নবজাতক, বয়োবৃদ্ধ এবং শারীরিক ও মানসিক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি।

দীর্ঘমেয়াদি রোগী: যারা আগে থেকেই হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা ফুসফুসের জটিল রোগে ভুগছেন।

ইনডোর বা গৃহকর্মী: যারা রান্নাঘরে চুলার পাশে কিংবা বদ্ধ ও উত্তপ্ত পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ কাজ করেন।

বিজ্ঞাপন

লক্ষণ দেখে সাবধান: কখন যাবেন ডাক্তারের কাছে?
গরমে কাজ করার সময় বা চলাফেরার ক্ষেত্রে শরীরে কিছু বিশেষ লক্ষণ দেখা দিলে সেটিকে অবহেলা না করে অবিলম্বে সতর্ক হতে হবে। চিকিৎসকদের মতে, এগুলো হিটস্ট্রোক বা তীব্র তাপজনিত অসুস্থতার পূর্ব লক্ষণ। লক্ষণগুলো হলো:

গায়ের চামড়া অতিরিক্ত গরম ও লালচে হয়ে যাওয়া।
তীব্র মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরানো এবং বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিক কমে যাওয়া কিংবা প্রস্রাবের রং গাঢ় বা পরিবর্তন হওয়া।
চরম গরমের মধ্যেও হঠাৎ ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া (এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক)।
চোখে ঝাপসা বা অন্ধকার দেখা।
বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন বা হার্টবিট অত্যন্ত দ্রুত হওয়া।
মানসিক বিভ্রান্তি, উন্মাদের মতো আচরণ করা কিংবা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়া।


ঝুঁকি এড়াতে আইসিডিডিআর,বি-এর জরুরি গাইডলাইন
তীব্র তাপপ্রবাহের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেকে ও পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষিত রাখতে আইসিডিডিআর,বি কিছু পালনীয় এবং বর্জনীয় নিয়ম মেনে চলার সুপারিশ করেছে:

যা অবশ্যই করবেন (করণীয়)
তীব্র ও কড়া রোদ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন। বাইরে বের হলে ছাতা ব্যবহার করুন বা মাথা ঢেকে রাখুন।
রোদে বা কায়িক পরিশ্রমের সময় মাঝে মাঝে ছায়াযুক্ত বা শীতল স্থানে গিয়ে বিশ্রাম নিন।
শরীরে বাতাস চলাচলের জন্য ঢিলেঢালা, হালকা রঙের সুতি ও আরামদায়ক পোশাক পরিধান করুন।
তৃষ্ণা না লাগলেও সারাদিনে প্রচুর পরিমাণে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি পান করুন।
নিয়মিত গোসল করুন এবং চোখে-মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিয়ে শরীর শীতল রাখুন।
সহজে হজম হয় এমন পুষ্টিকর, টাটকা ও হালকা খাবার গ্রহণ করুন।
যা থেকে বিরত থাকবেন (বর্জনীয়)
বাসি, পচা ও অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।
সরাসরি রোদের মধ্যে একটানা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো প্রকার কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করবেন না।
রাস্তার খোলা বা অনিরাপদ পানি, শরবত এবং কৃত্রিম রং মিশ্রিত ঠান্ডা পানীয় পরিহার করুন।
পরিবারের জন্য বিশেষ সতর্কতা
আইসিডিডিআর,বি তাদের বিশেষ নির্দেশনায় জানিয়েছে, আপনার পরিবারে যদি শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী কিংবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি থাকেন, তবে এই সময়ে তাদের দিকে আলাদা নজর দিতে হবে। ঘরের পরিবেশ যাতে অতিরিক্ত গরম না হয়ে যায়, সেজন্য জানালা খুলে বা ফ্যান চালিয়ে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। অসুস্থ বোধ করামাত্রই কোনো প্রকার কবিরাজি বা ঘরোয়া টোটকার ওপর নির্ভর না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা হয়েছে।

‘পানিশূন্যতায় বিকল হতে পারে কিডনি’
চলতি তীব্র তাপপ্রবাহ ও উদ্ভূত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক এবং ইমেরিটাস অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে এবং বাতাসে অস্বাভাবিক আর্দ্রতার কারণে সারাদেশে জনজীবন বিপর্যস্ত। এসময় প্রচুর ঘামের ফলে পানির সঙ্গে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় লবণও বেরিয়ে যায়। ফলে রক্তচাপ কমে যাওয়া, দুর্বলতা, মাথা ঝিমঝিম করা এবং মারাত্মক পানিস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। এই পানিস্বল্পতা অবহেলা করলে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং কিডনি বিকল হওয়ার মতো জটিলতর সমস্যা হওয়াও বিচিত্র নয়।

তিনি আরও জানান, মাত্রাতিরিক্ত গরমের কারণে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে হলে ‘হিটস্ট্রোকের’ মতো মারাত্মক আশঙ্কা থাকে। এই অবস্থায় রোগীর শরীরে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রা, ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া, শুষ্ক ও লালচে ত্বক, অসংলগ্ন আচরণ এবং খিঁচুনির মতো বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ও চর্মরোগের বিষয়ে ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ উল্লেখ করেন, এই তাপদাহে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী, প্রতিবন্ধী এবং যারা মাঠে-ময়দানে কায়িক পরিশ্রম করেন (যেমন কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক) তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন। এর পাশাপাশি সরাসরি সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির কারণে ত্বক লাল হওয়া, জ্বালাপোড়া করা বা ফোসকা পড়ার মতো ‘সান বার্ন’ এবং ঘাম ও ময়লা জমে ত্বকে ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকজনিত ইনফেকশন হতে পারে।

এছাড়া গরমে তৃষ্ণা মেটাতে রাস্তাঘাটের অবিশুদ্ধ পানি বা শরবত খাওয়ার কারণে ডায়রিয়া, বমি, টাইফয়েড ও জন্ডিসের মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব অনেক বেড়ে যায় বলে তিনি সতর্ক করেন।

সুস্থ থাকার উপায় ও জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা
এই ইমেরিটাস অধ্যাপক পরামর্শ দেন, ‘তীব্র গরমের সময়ে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়া একদমই উচিত নয় এবং বাইরে বের হলে ছাতা, টুপি ও হালকা ঢিলেঢালা সুতি কাপড় ব্যবহার করতে হবে। শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি লবণের ঘাটতি মেটাতে ওর স্যালাইন, ডাবের পানি ও টাটকা ফলের শরবত খাওয়া জরুরি।
 
যদি কেউ অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ বা হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হন, তবে তাকে দ্রুত ছায়াযুক্ত শীতল স্থানে নিয়ে ফ্যান বা বাতাস করতে হবে। একই সঙ্গে ভেজা কাপড়ে শরীর মুছে চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিতে হবে। এসময় অবস্থা গুরুতর হলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
BBS cable ad