অপরাধী যে দলেরই হোক, পার পাবে না: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অপরাধী কোন রাজনৈতিক দলের বা কার লোক—সেটি বিবেচনা না করে প্রশাসনকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। এসময় তিনি স্পষ্ট জানান, বর্তমান সরকারের আমলে কোনো অপরাধীর রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ নেই।
শনিবার (১৮ জুলাই) সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর সফরকালে দুটি পৃথক জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এদিন তিনি শাহজাদপুরে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন, দুস্থদের মাঝে খাদ্য সামগ্রী ও অর্থ বিতরণ, কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভেন্ডিং মেশিন ও শিক্ষার্থীদের মাঝে হাইজিন কর্নার উদ্বোধন ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণসহ নানা কর্মসূচিতে অংশ নেন।
সকালে মণিরামপুর বাজার সংলগ্ন ছোট ব্রিজ হতে লালপুর পর্যন্ত খাল পুনঃখনন প্রকল্প পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি দুস্থ ও অসহায় পরিবারের মাঝে খাদ্য সামগ্রী ও অর্থ বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অপরাধ সবার জন্যই অপরাধ। সে কোন দল করল, সে কার লোক—আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটা কোনো বিবেচনার বিষয় না। বেআইনি কাজ করলে আইন তাকে ধরবেই, এটা আমি আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি।’
আ'লীগ সরকারের আমলকে দুঃশাসন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগের আমলে দেখেছেন অপরাধীরা পার পেয়ে যেত। কারণ তখনকার ক্ষমতাসীন এমপিদের প্রশ্রয়ে অপরাধীরা থাকত। আমরা সেটা হতে দেব না এবং গত পাঁচ মাসে আমরা তা প্রমাণ করেছি। এমনকি রাতদুপুরেও ওসি সাহেব যখন আমাকে ফোন করে জানতে চান যে অমুক প্রভাবশালী অপরাধীকে ধরা যাবে কি না, আমি সরাসরি বলে দেই—আমি শুনতে চাই না উনি কে। অপরাধী যে-ই হোক, আইনে যা করার কথা, পুলিশ যেন সেটাই করে।’
ত্রাণ ও সরকারি সাহায্য বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক কর্মীরা সমাজ ও গরিব মানুষের চেনে বিধায় তারা তালিকা তৈরিতে প্রশাসনকে সহযোগিতা করবে। কিন্তু বিতরণের মূল দায়িত্ব থাকবে সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর, যাতে যার যা প্রাপ্য ও ন্যায্য অধিকার, তা যেন সুন্দরভাবে সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছায়। কারণ এই সরকারের সব সাহায্য সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় কেনা।’
রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে ড. এম এ মুহিত বলেন, ‘আপনারা রাজনীতি করতে এসেছেন মানুষের সেবার জন্য, মানুষকে বিরক্ত করার বা সমস্যা তৈরি করার জন্য নয়।’
পৌরসভার ডাস্টবিন ও ওয়াশরুম নির্মাণের উদ্বোধন করে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন , ‘প্রধানমন্ত্রী আস্থা রেখে আমাকে মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এখন আমাকে সারা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দেখতে হচ্ছে। তবে আমার নিজের এলাকা শাহজাদপুরের মূল সমস্যাগুলো আমি নির্বাচনের সময়ই চিহ্নিত করেছি। এর মধ্যে এক নম্বর অগ্রাধিকার হলো মাদকের বিস্তার রোধ করা। শাহজাদপুর শহরে মাদকের ব্যাপারে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে।’
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘থানার ওসিকে দল-মত ও রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে বলেছি। তরুণ সমাজকে বাঁচাতে মাদক ও কিশোর গ্যাং নির্মূল করতেই হবে। আপনি এক হাজার দালান তোলেন বা অনেক টাকা কামান, কিন্তু সন্তান যদি মানুষ না হয় তবে সব বৃথা।’
শাহজাদপুরের জরাজীর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত পাঁচ থেকে দশ বছরে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তারা রাস্তাঘাটের ন্যূনতম রক্ষণাবেক্ষণও করেননি। আমরা ইতিমধ্যেই ছোট-বড় বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে রাস্তাঘাটের সংস্কার কাজ শুরু করেছি। আমি নিজে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সচিবালয়ে গিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সাথে তালিকা ধরে তদবির করছি যাতে দ্রুত শাহজাদপুরের সব ইউনিয়নের রাস্তাঘাট ঠিক করা যায়।’
তরুণ সমাজকে মাদক ও অপকর্ম থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার ওপর বিশেষ জোর দেন প্রতিমন্ত্রী। এসময় তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমরা শাহজাদপুরে একটি বড় ও আন্তর্জাতিক মানের সুন্দর স্টেডিয়াম তৈরি করতে চাই। এ বিষয়ে আমি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এবং জাতীয় ফুটবল দলের প্রাক্তন অধিনায়ক আমিনুল হকের সাথে কথা বলেছি। তিনি নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছেন এবং আমরা এখন সুনির্দিষ্ট জায়গা খুঁজছি। এছাড়া প্রত্যেকটি ইউনিয়নে অন্তত একটি করে সরকারি খেলার মাঠ তৈরি করা হবে, যা তরুণদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটাবে।’
পরে বিকেলে শাহজাদপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিরতা জহুরা খাতুন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও জামিরতা ডিগ্রি কলেজে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রতিমন্ত্রী। এসময় তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘প্লেনের পাইলট, আর্মি জেনারেল, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা আইনজীবী হওয়া—সবকিছুই সম্ভব, শুধু নিজের মনের মধ্যে বিশ্বাস রাখবে।’
সফলতার সংজ্ঞা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সবাইকে যে বড় কিছু হতে হবে তা নয়, তবে অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ হওয়া, বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়া এবং সন্তানকে সুন্দর করে বড় করাটাও জীবনের বড় সার্থকতা।’
অন্যায়ের বিরুদ্ধে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন: ‘অন্যায় দেখলে সম্ভব হলে প্রতিবাদ করবে, সম্ভব না হলে কখনো ওইটার ভেতরে জড়াবে না। অন্যায়কারী কিন্তু নীরব সমর্থনে আস্তে আস্তে বড় হয়ে যায়।’
দেশপ্রেম ও নাগরিক দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি পুরো দেশটাকে নিজের বাড়ি-ঘর ভাবি এবং সবকিছু গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করি, তাহলে এমনিতেই আমাদের পরিবেশটা ভালো হয়ে যাবে।"
জীবনের পথ ও লক্ষ্য নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, ‘শুধু গন্তব্য বড় না, এই পথটাই বড় জার্নি। যখন একটা লক্ষ্য স্থির করে ওটার জন্য কাজ করবে, তখন সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথটাই সুন্দর হয়ে উঠবে।’
নিজের দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘তোমাদের জন্য ভালো পরিবেশ, নিরাপদ পরিবেশ এবং স্বপ্ন দেখার ও স্বপ্নের জন্য কাজ করার পরিবেশ তৈরি করাটাই আমার চাকরি। তোমাদের ভালো কিছু করার জন্য যা কিছু লাগবে, আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’
তিনি জামিরতা জহুরা খাতুন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে হাইজিন কর্নার উদ্বোধন ও শিক্ষার্থীদের মাঝে ছাতা ও গাছের চারা বিতরণ করেন। জামিরতা ডিগ্রি কলেজের একাডেমিক ভবন সম্প্রসারণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং বই বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। পরে অধ্যাপক ড. এম এ মতিন স্মৃতি জেলা ফুটবল টুর্নামেন্ট উদ্বোধন করেন এবং সোনাতনী হাই স্কুল পরিদর্শন করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ করেন।




