শিরোনাম

Space for ads

মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের জন্য লাশ কাটাছেঁড়া করা কি জায়েজ?

 প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ১২:১০ অপরাহ্ন   |   স্বাস্থ্যকর্মী

মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের জন্য লাশ কাটাছেঁড়া করা কি জায়েজ?
Space for ads

মুফতি ওমর বিন নাছির
 
ইসলাম মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে তার সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। মানুষের দেহ শুধু কিছু অস্থি, মাংস ও রক্তের সমষ্টি নয়; বরং এটি আল্লাহ তাআলার এক মহামূল্যবান আমানত।


জীবিত অবস্থায় যেমন মানুষের জীবন, দেহ ও সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা ফরজ, তেমনি মৃত্যুর পরও তার মরদেহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইসলামী শরিয়তের অবিচ্ছেদ্য নির্দেশ।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো অ্যানাটমি শিক্ষা, যেখানে মানবদেহের গঠন বোঝার জন্য মৃতদেহ কাটাছেঁড়া করানো হয়। কিন্তু একজন মুসলিম শিক্ষার্থীর মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এভাবে মৃত মানুষের দেহ কাটাছেঁড়া করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কি? যদি এটি বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে তার করণীয় কী?

প্রথমত : ইসলামে মানুষের মর্যাদা
মানুষকে আল্লাহ তাআলা সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে বিশেষ সম্মান দান করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।


’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৭০)
এই আয়াত প্রমাণ করে, মানুষের মর্যাদা শুধু জীবিত অবস্থার জন্য নয়; বরং তার মানবিক সত্তার জন্য। তাই মৃত্যুর পরও তার মরদেহকে অবমাননা করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
দ্বিতীয়ত : মৃতদেহের সম্মান জীবিতের মতোই
রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃত ব্যক্তির মর্যাদাকে জীবিত মানুষের মর্যাদার সমপর্যায়ে বিবেচনা করেছেন। আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মৃত ব্যক্তির হাড় ভেঙে ফেলা জীবিত অবস্থায় তার হাড় ভেঙে ফেলার মতোই।


’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬১৬)
তৃতীয়ত : অঙ্গহানি নিষিদ্ধ
যুদ্ধক্ষেত্রেও ইসলামে মৃতদেহ বিকৃত বা অঙ্গহানি করা নিষিদ্ধ। মুগিরা ইবনে শুবা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মহানবী (সা.) অঙ্গহানি করতে নিষেধ করেছেন।’ (তাহাবি, হাদিস : ৫০২৪)
যদি শত্রুর মৃতদেহ বিকৃত করা নিষিদ্ধ হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের দেহ কাটাছেঁড়া করা কতটা গুরুতর বিষয়—তা সহজেই অনুমেয়।

বিখ্যাত ফিকহ বিশ্বকোষ ‘আল-মাওসুআহ আল-ফিকহিয়্যাহ’(২৬/১০২)-এ বলা হয়েছে—ফোকাহায়ে কেরাম একমত যে মানুষের চুল বিক্রি করা বা তা থেকে উপকার গ্রহণ করা জায়েজ নয়। কারণ মানুষ সম্মানিত; তাই তার কোনো অংশকে অবমাননা করা বৈধ নয়।


এখানে মানুষের একটি ক্ষুদ্র অংশ—চুল—সম্পর্কেও সম্মান রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তাই শিক্ষার উদ্দেশ্য হলেও মৃত মানুষের দেহ কেটে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করা, হাড় ভাঙা বা দেহ বিকৃত করা মূলত শরিয়তের দৃষ্টিতে উচিত নয়। কারণ এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। তবে যদি মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর জন্য এটি বাধ্যতামূলক হয়, এবং যদি কোনো দেশে এমন ব্যবস্থা থাকে যে মৃতদেহ কাটাছেঁড়া ছাড়া চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা সম্পন্ন করা সম্ভব নয় এবং শিক্ষার্থী বাস্তবিকই বাধ্য হয়, তাহলে তার করণীয় হলো—সে নিজের পক্ষ থেকে এ কাজকে বৈধ মনে করবে না, নিয়মিত ইস্তিগফার করবে এবং প্রয়োজনে ন্যূনতম সীমায় অংশগ্রহণ করবে। (হিদায়াহ, ৬/৪২৫, দুররুল মুখতার ও রাদ্দুল মুহতার, ৫/৫৮, ফাতহুল কাদির, ৬/৪২৫-৪২৬, বাদায়েউস সানাই, ৬/১৪২, মাজমাউল আনহার, ৩/৮৫-৮৬)

সম্ভাব্য শরিয়তসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা
চিকিৎসা শিক্ষা অব্যাহত রাখার জন্য নিম্নোক্ত বিকল্পগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে—

১. উন্নতমানের কৃত্রিম মানবদেহ বা থ্রিডি অ্যানাটমিক্যাল মডেল ব্যবহার করা।
২. ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, ডিজিটাল অ্যানাটমি ও ত্রিমাত্রিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া।
৩. প্রাণীর দেহ (যেখানে শিক্ষাগতভাবে উপযোগী) ব্যবহার করা।
৪. অস্ত্রোপচারের সময় পর্যবেক্ষণমূলক শিক্ষা গ্রহণ করা।
৫. বৈধ শিক্ষামূলক ভিডিও, থ্রিডি অ্যানিমেশন ও সিমুলেশন ব্যবহার করা।

এ ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা বর্তমানে বিশ্বের অনেক মেডিক্যাল প্রতিষ্ঠানে ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই জীবিত মানুষের মতো মৃত মানুষের মরদেহও সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তার দাবিদার। অতএব উপরোক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে, চিকিৎসা শিক্ষার উদ্দেশ্যে মৃতদেহ কাটাছেঁড়া বৈধ নয়। তবে যদি কোনো মুসলিম শিক্ষার্থী এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থায় বাধ্য হয়ে পড়েন, যেখানে এর কোনো বাস্তব বিকল্প নেই, তাহলে তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত এতে জড়াবেন না এবং শরিয়তসম্মত বিকল্প প্রতিষ্ঠার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন।

উল্লেখ্য : সমকালীন কিছু আলেম চিকিৎসাবিজ্ঞানের অপরিহার্য প্রয়োজন, জনকল্যাণ এবং নির্দিষ্ট শর্ত (যেমন অনুমোদিত দেহ, মর্যাদা রক্ষা, প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম না করা ইত্যাদি) সাপেক্ষে মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদকে বৈধ বলেছেন। 
BBS cable ad

স্বাস্থ্যকর্মী এর আরও খবর: