জীবাণু যেভাবে যাচ্ছে খাবার টেবিলে
নোংরা পানিতে ধোয়া হয় ফল-সবজি, বাড়ছে নানা রোগের ঝুঁকি
নাহিদুর রহমান হিমেল
চিত্র-১ : মঙ্গলবার সকাল ৬টা। রাজধানীর শ্যামবাজার ঘাট এলাকায় দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে ট্রলারে এলো তরমুজ ও পেয়ারা। নামানোর পর শ্রমিকরা সরাসরি বুড়িগঙ্গার কালচে পানিতে ধুয়ে তা রাস্তার পাশে রাখলেন। এরপর সেখান থেকে খুচরা বিক্রেতারা ভ্যানে-মিনি ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছেন নিজ নিজ বিক্রিয়স্থলের অলি-গলিতে। কোথাও আবার দেখা গেল ফলের গায়ে জমে থাকা কাদা পরিষ্কার করতে নদীর পানি বালতিতে তুলে ব্যবহার করা হচ্ছে। মোছা হচ্ছে ময়লা গামছা দিয়ে। একইভাবে সবজি বহনকারী প্লাস্টিকের ক্যারেট ও বাঁশের ঝুড়িও ধোয়া হচ্ছে নদীর পানিতে।
চিত্র-২ : বুধবার ভোর সাড়ে ৪টা। যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজার আড়তে এলো ও শাক-সবজিবোঝাই ট্রাক। ট্রাক থেকে নামানোর পর কাদা, ধুলা বা পচা অংশ পরিষ্কার করতে রাস্তার পাশে ড্রামে জমে থাকা নোংরা পানিতে ধোয়া হচ্ছিল পাটশাক, পুঁইশাক। এ ছাড়া একটি ড্রামে কালো নোংরা পানিতে লাউ, শসা, বেগুন, টম্যাটো ধুইছিলেন দুই যুবক। তাদের একজন জানান, এত সবজি ধোয়ার মতো পানি আনা কষ্টকর। তাই এই ড্রামের পানিতে শুধু সবজির গায়ে লেগে থাকা কাদা-বালি ধোয়া হচ্ছে।
চিত্র-৩ : বুধবার সকাল ১০টার দিকে বুড়িগঙ্গার ধারে সিঁড়িতে শসা ও আমড়া ধুতে দেখা যায় এক কিশোরকে। নদীর নোংরা পানিতে শসা ও আমড়ার গায়ে লেগে থাকা কাদামাটি ধুয়ে ঝুড়িতে রাখছিলেন তিনি। এর আগে ঝুড়িটি নদীর ওই নোংরা পানিতেই ধোয়া হয়।
এ চিত্র নতুন কিছু নয়, নিত্যদিনের। একসময় রাজধানী ঢাকার প্রাণ হিসেবে পরিচিত বুড়িগঙ্গা এখন যেন এক চলমান বিষাক্ত জলাধার। শিল্পকারখানা-হাসপাতালের বর্জ্য, ড্রেনের পয়োবর্জ্য আর রাসায়নিক মিশে নদীর পানি অনেক আগেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অথচ সেই দূষিত পানিতেই ধোয়া হচ্ছে রাজধানীর বিভিন্ন আড়ত ও কাঁচাবাজারে আসা ফলমূল ও শাকসবজি। পরে সেগুলো ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীর অলিগলি, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বাসাবাড়ির খাবার টেবিলে।
রাজধানীর শ্যামবাজার, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর ও আশপাশের বিভিন্ন পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ট্রলার ও ট্রাকে করে আসা ফল-সবজি দ্রুত চকচকে ও সতেজ দেখাতে ব্যবহার করা হচ্ছে ময়লা পানি। বিশেষ করে শ্যামবাজারে নদীপথে আসা তরমুজ, পেয়ারা ও বিভিন্ন ফল বুড়িগঙ্গার কালচে পানিতে ধুয়ে বাজারে তোলা হচ্ছে। অন্যদিকে যাত্রাবাড়ীর কাঁচাবাজার আড়তে ট্রাক থেকে নামানোর পর শাকসবজি নোংরা পানি দিয়ে ধোয়ার দৃশ্য নিয়মিত।
আড়তের শ্রমিকরা বলছেন, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা সবজি অনেক সময় শুকিয়ে যায় বা কাদামাখা থাকে। দ্রুত বিক্রির জন্য সেগুলো ধুয়ে চকচকে করা হয়। কিছুটা তাজাও দেখা যায়। কিন্তু পরিষ্কার পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেকে পাশের নোংরা পানিই ব্যবহার করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাজারের ভিতরে অনেক জায়গায় ড্রেন উপচে পানি জমে থাকে। সেই পানি দিয়েই কখনো ঝুড়ি, কখনো প্লাস্টিকের ক্যারেট, আবার কখনো সরাসরি সবজি ধোয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ড্রামে রাখা একই পানি ময়লাযুক্ত হওয়ার পরও বারবার ব্যবহার করা হয়।
নগরবাসীর অভিযোগ, রাজধানীর বড় বড় পাইকারি বাজারে কীভাবে খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ ও পরিষ্কার করা হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। বাজার তদারকি ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের ঘাটতি দূর করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পানিতে ই-কোলাই, সালমোনেলা, শিগেলা, কলেরা ও হেপাটাইটিস-এ ভাইরাসের মতো ক্ষতিকর জীবাণু থাকতে পারে। এসব জীবাণু শাকসবজির গায়ে লেগে বাসাবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কাঁচা সালাদ বা কম ধোয়া সবজি খেলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ে। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। রাস্তার পাশের কাটা ফল বা সরাসরি পরিবেশিত ফলমূলের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। এ ছাড়া পাতাযুক্ত শাকসবজিতে ঝুঁকি বেশি।




