শিরোনাম

Space for ads

বন্ধ করতে হবে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার

 প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০১:১৮ অপরাহ্ন   |   এলোপ্যাথি

বন্ধ করতে হবে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার
Space for ads

অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ নিয়ে সম্প্রতি খুব মাতামাতি হচ্ছে। আমি বলি, এটা দীর্ঘদিনের ব্যাপার।

এবারের ঘটনা হলো হাসপাতালের আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ৪১ শতাংশ রোগীর অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ডেভলাপম্যান্ট। অর্থাৎ, রোগীর শরীরে প্রাণ রক্ষাকারী প্রতিষেধক ওষুধ অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। খবরটা খুবই মর্মান্তিক।
ডাক্তাররা অসহায় বোধ করছেন। 

অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে এরূপ ঘটনা যে ঘটবে সেটা চিকিৎসক সমাজ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ওষুধ প্রশাসন, সাধারণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, গ্রাম ডাক্তার- সবার নজরে থাকার কথা।

প্রশাসন এখনও জেনে না জানার ভান করলে এভাবে সমগ্র জনগোষ্ঠীর ওপর দুর্যোগ নেমে আসবে। যারা দেশের বাইরে থাকে তারা জানে, রেজিস্টার্ড ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া পৃথিবীর কোনও দেশে কোনও ফার্মেসি অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রি করে না। শুধু আমাদের দেশে ব্যতিক্রম। যখন জানা গেল আইসিউতে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না তখন সবার দৌড়ঝাঁপ শুরু হলো। আমাদের দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ অপব্যবহার দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ওষুধ প্রশাসন যদি কঠোর কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা না নেয়, এগুলো চলতে থাকবে। 

১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশে হাট-বাজারে, গ্রামে-গঞ্জে, শহরে লাখো ওষুধের দোকান। তাতে নির্ভয়ে ওষুধ দোকানিরা অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করছে। সেখানে না আছে মাত্রা, না আছে কতদিন খেতে হবে-কথাটা। এভাবে আন্ডার ডোজ এবং অনিয়মিত ব্যবহারের ফলে রোগীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে। তাই আইনের প্রয়োগ চাই। ভিজিল্যান্স টিম পাঠাতে হবে। প্রমাণ সাপেক্ষে স্পট জাজমেন্ট, লাইসেন্স বাতিল, সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। গ্রাম ডাক্তারদের কঠোরভাবে সাবধান করে দিতে হবে। আমাদের দেশে সব জায়গায় আইন আছে। তবে আইনের প্রয়োগ নাই। এটার পিছনে কারণ হতে পারে দুর্নীতি। অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিত বিক্রয় বন্ধ করতে হবে। 

আজ বিক্রেতাদের দোষ দিচ্ছে, ডাক্তারদের দোষারোপ করছে, প্রায় ডাক্তাররা অবাধে অ্যান্টিবায়োটিক লিখছে, ওষুধ দোকানদাররা অবাধে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করছে। এ ব্যাপারে কোনোকালে কারো মাথাব্যথা ছিল না। অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কোনও সময় কোনও কার্যকর ভূমিকা দৃশ্যমান হয়নি। বহির্বিশ্বে ব্যবস্থাপত্র ছাড়া একমাত্র প্যারাসিটামল ট্যাবলেট বিক্রি হয়। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অবহেলার কারণে আজ দেশে নিরীহ রোগীরা চিকিৎসা বিভ্রাটে পড়ছে। তাদের জীবন সংকটাপন্ন। হাসপাতালের আইসিইউতে ক্রিটিক্যাল রোগীদের রাখা হয়। তারা প্রতিনিয়ত জীবন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। সেখানে ৪১ শতাংশ রোগীর শরীরে জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ যদি কাজ না করে তবে একবার ভাবুনতো রোগীরা কত সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে তাদের এ অবস্থা। এটা মারাত্মক এবং প্রাণঘাতি অপরাধ। 

আমি ডাক্তারি পেশা শুরু করি ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি থেকে রাউজানের নোয়াপাড়া পথেরহাটে। তখনও দেখতাম, গ্রাম ডাক্তাররা নির্ভয়ে ডোজের তোয়াক্কা না করে অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন ‘পেনিসিলিন’ কম্বায়োটিক রোগীদের ওপর ব্যবহার করছে। অ্যান্টিবায়োটিক রোগের মহাপ্রতিষেধক ওষুধ। নির্দিষ্ট জীবাণুর ওপর নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয়। এটি শরীরে প্রদাহে ব্যবহৃত হয়। অপারেশন সংক্রান্ত ব্যাপারে প্রয়োগ হয় এটি, যেমন: জীবন রক্ষাকারী আবার এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। তাই নিয়ম অনুযায়ী স্কিন টেস্ট করে বা কালচার সেনসিটিভিটি টেস্ট করে এটা প্রয়োগ করে থাকে। রেজিস্ট্যান্স কথাটার অর্থ হলো- নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক যখন নির্দিষ্ট রোগ-জীবাণু ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয় তখন ঐ অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে যায়। 

অল্পশিক্ষিত, অশিক্ষিত এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী আমাদের দেশে অনেক আছে। তাদের মধ্যে ডাক্তারদের ফি দেওয়ার ভয়ে অনেক পরিবার ডাক্তারের শরণাপন্ন হয় না। তাই তারা প্রথমেই ফার্মেসিতে চিকিৎসা নেয়। ফার্মেসিওয়ালা কয়েকটা ট্যাবলেট ক্যাপসুল দিয়ে বলে-এগুলো খেয়ে দেখেন। এখানেই গণ্ডগোল। ডেইলি লেবার থেকে শুরু করে ২০%-২৫% লোক এটা করে। রোগীদের বলা হলো অ্যান্টিবায়োটিক ৭-১০ দিন চলবে। আর রোগী তিনদিন পর ভালো লাগলে নিজে নিজে ওষুধ বন্ধ করে দেয়। যে মাত্রায় খেতে বললো সেটাও করল না। প্রাণীর চিকিৎসায়ও প্রচুর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয়। এই সমস্ত কারণে রেজিস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে। বর্তমান কোনও কোনও রোগীর ক্ষেত্রে ২-৩টা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হচ্ছে। রোগীদের খরচ বেড়ে গেছে। সুস্থ হতে সময় লাগছে। তার ওপর ওষুধের চড়া দাম। রোগ হলে দিশাহারা হচ্ছে মানুষ। তাই গরীবদের উদ্দেশে বলি, আপনারা সরকারি হাসপাতালগুলোতে যান। অন্তত সুনির্দিষ্ট একটা চিকিৎসা পাবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা দ্রুত জটিল হচ্ছে। প্রতি চার নমুনায় একটিতে জীবাণু পাওয়া যাচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উচ্চ প্রতিরোধী। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে- ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাকের বিরুদ্ধে নিত্যব্যবহার্য ওষুধ কাজ করছে না। নিউমোনিয়া আক্রান্ত ৬৪ ভাগ শিশু প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। তাই ওষুধ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে আরও কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। রেজিস্টার্ড ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনভাবে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রয় করা যাবে না। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অসম্ভব নয়। সরকার যদি কার্যত এগিয়ে আসে, বিজ্ঞানীদের গবেষণার আরো সুযোগ করে দেওয়া হয়-তবে সম্ভব। এর সাথে ডাক্তারের ভূমিকা অনেক। 

বিশ্বে প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার হয় ‘পেনিসিলিন’, ১৯২৮ সালে। নোবেলজয়ী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং এর এই কালজয়ী প্রতিষেধক আবিষ্কার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪ সালে শুরু হয়েছিল) যুদ্ধাহত হাজার হাজার মৃত্যুপথযাত্রী সৈনিকদের প্রাণ রক্ষা করেছিল। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সময় ‘স্ট্যাফাইলোকক্কাস’ নামে এক জীবাণু নিয়ে গবেষণার সময় আকস্মিকভাবে জীবাণুনাশক এই ‘পেনিসিলিন’ আবিষ্কার করেন তিনি।

বর্তমান যাদের বয়স ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে তারা ইনজেকশন ক্রিস্টেলাইন পেনিসিলিনের প্রয়োগ দেখেছেন। এরপর আসে অ্যাম্পিসিলিন। জেনারেশন আফটার জেনারেশন অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের দেশে আসতে থাকে। বিজ্ঞানের বদৌলতে এই প্রতিষেধক আবিষ্কার না হলে মানবজীবন মহাসংকটে থাকতো। এটা সহজলভ্য হওয়ায় আমরা এর যথেচ্ছ ব্যবহারকারী। বিশ্ব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল সচেতনতা সপ্তাহে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রতিবেদনে ২০২৪-২০২৫ প্রতিপাদ্য ছিল ‘এখনই পদক্ষেপ নিন। আমাদের বর্তমানকে রক্ষা করুন’। 

দেশে সর্বাধিক ব্যবহৃত ১০টি অ্যান্টিবায়োটিক হলো- সেফট্রিয়াক্সোন, সেফিক্সিম, মেরোপেনেম, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, অ্যাজিথ্রোমাইসিন, অ্যামোক্সিসিলিন, মেট্রোনিডাজল, ক্লক্সাসিলিন, পাইপেরাসিলিন-টাজোব্যাকটাম ও ভ্যানকোমাইসিন। এগুলো অযথা ব্যবহারের ফলে কার্যকারিতা দ্রুত কমে যাচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ও অতিরিক্ত ব্যবহার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে (এএমআর) বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এটি এখন দেশের জন্য বড় জনস্বাস্থ্যঝুঁকি। 

লেখক: প্রাক্তন চিফ অ্যানাসথেসিওলজিস্ট, বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল-চট্টগ্রাম।

BBS cable ad

এলোপ্যাথি এর আরও খবর: