চিকিৎসা শিক্ষার বাতিঘর চট্টগ্রামের ১০ মেডিক্যাল কলেজ
সন্তানকে চিকিৎসক বানাতে আগ্রহী মা-বাবার স্বপ্ন পূরণে অবদান রাখছে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) স্বীকৃতিপ্রাপ্ত চট্টগ্রামের ১০টি সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ। এর মধ্যে একটি সরকারি।
কঠিন প্রতিযোগিতায় সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে না পারা মেধাবী শিক্ষার্থীরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এমবিবিএস-বিডিএস ডিগ্রি নিয়ে পেশায় সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন। বেসরকারিতে পাঁচ বছরের ডিগ্রি নিতে একজন শিক্ষার্থীর ব্যয় হয় ২৫-৩০ লাখ টাকারও বেশি।
এসব প্রতিষ্ঠানে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের অনেক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থীর ফলাফলও ঈর্ষণীয়।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ: ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে ৫ বছর মেয়াদি এমবিবিএস শিক্ষাক্রম চালু রয়েছে। আগে প্রতিবছর ২৫০ জন এমবিবিএস শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতো।
২০২৫ সালে ২৫টি আসন কমানো হয়। এছাড়া ১৯৯০ সালের ৫ জানুয়ারি ডেন্টাল ইউনিট চালু হয় এবং ব্যাচেলর অব ডেন্টাল সার্জারি (বিডিএস) কোর্সে প্রতিবছর ৬০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। ডা. আলতাফ উদ্দীন আহমেদ এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন। বর্তমান অধ্যক্ষ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের (চমেক) মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. জসিম উদ্দিন। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় তাঁকে চমেকের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
১৯০১ সালে আন্দরকিল্লায় প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল। সেই প্রাঙ্গণে ১৯২৭ সালে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল স্কুলের কার্যক্রম শুরু হয়, যেখানে চার বছর মেয়াদি এলএমএফ ডিগ্রি প্রদান করা হতো। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালই চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষাঙ্গন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৯৬০ সালে এটি পাঁচলাইশ কে. বি ফজলুল কাদের রোডে বর্তমান ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়। মাত্র ২৬ জন শিক্ষক এবং ৭৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এর যাত্রা শুরু। তখন এই কলেজে তিনটি বিভাগ ছিল: অ্যানাটমি, ফিজিওলজি এবং বায়োক্যামিস্ট্রি। চালু ছিল মেডিসিন, সার্জারি এবং ধাত্রীবিদ্যা ও স্ত্রীরোগবিদ্যা বিভাগ। এখানে বর্তমানে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ৪০টি বিষয়ে এমডি, এমএস, এমফিল, ডিপ্লোমা, এফসিপিএস এবং এমপিএইচ শিক্ষাক্রম চালু রয়েছে।
অ্যাকাডেমিক ভবনে ৫টি লেকচার গ্যালারি (সালাম, বরকত, সুতপা, জব্বার ও রফিক), ৩০টি টিউটোরিয়াল রুম, ২টি শব ব্যবচ্ছেদ কক্ষ, ৭টি ল্যাবরেটরি এবং ১টি ফরেনসিক মর্গ রয়েছে। কলেজ ক্যাম্পাসে ১০ তলা বিশিষ্ট একটি নতুন অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণ হয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ২০ শয্যাবিশিষ্ট মিশকাতুর রহমান ফাহিম স্মৃতি স্টুডেন্ট ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আন্ডারগ্রাজুয়েট ও পোস্টগ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক লাইব্রেরি, ক্যাম্পাসে স্থাপিত বিশ্বের প্রথম বোনস লাইব্রেরিতে মানবদেহের বিভিন্ন হাড় সংরক্ষিত রয়েছে, যা ডা. মনসুর খলিলের নামে নামকরণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সাহিত্য ও মুক্তচিন্তার চর্চা বাড়াতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাহিত্য লাইব্রেরি। শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য রয়েছে ৭টি ছাত্রাবাস।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে ছাত্র সংসদ (চমেকসু) কার্যক্রম পরিচালনা করে। শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন ও অধিকার সংরক্ষণে ১৯৮০ সালে গঠিত হয় কলেজ শিক্ষক সমিতি। সেবামূলক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে সন্ধানী ইউনিট নিয়মিত রক্তদান, থ্যালাসেমিয়া প্রকল্প ও ওষুধ বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করে। শিক্ষার্থীদের যুক্তিবোধ ও বিশ্লেষণী চিন্তা বিকাশে রয়েছে বিতর্ক ক্লাব এবং গবেষণামুখী কার্যক্রমে অংশ নিতে রিসার্চ ক্লাব। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে কাজ করে কালচারাল ক্লাব। সহশিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস উদযাপন, ব্যাচ ডে, সিএমসি ডে, ইয়ার এন্ডিং প্রোগ্রাম, বাণী অর্চনা, পিঠা উৎসব, বসন্তবরণ, চলচ্চিত্র উৎসব, পহেলা বৈশাখ ও নতুন বছর উদযাপনসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও ক্রীড়া চর্চার লক্ষ্যে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ক্যাম্পাসে অবস্থিত ডা. মিলন মুক্তমঞ্চ শিক্ষার্থীদের মুক্তচিন্তা, মত প্রকাশ ও আলোচনার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অন্যতম চার শহীদ এই কলেজের। তাঁরা হলেন- চমেক ৮ম ব্যাচের ডা. কে বি এনামুল হক, ১২তম ব্যাচের ছাত্র মো. জাকির হোসেন খান, ৯ম ব্যাচের আবু মো. জসীম উদ্দীন চৌধুরী এবং ১৪তম ব্যাচের কাজী সাদিক হাসান। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. শাহ আলম চমেক ১৩তম ব্যাচের ছাত্র। তিনি নৌ-কমান্ডো হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতার জন্য বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন। উল্লেখ্য, ডা. শাহ আলমই চিকিৎসকদের মধ্যে একমাত্র বীর উত্তম খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা।
আইএএইচএস: খুলশীর ফয়’স লেক এলাকায় জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত ইউএসটিসি’র ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড হেলথ সায়েন্সেস (আইএএইচএস) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) অধীনে একটি বেসরকারি মেডিক্যাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৪ সালে ৪২ জন শিক্ষার্থী, ২ জন অধ্যাপক ও ৯ জন প্রভাষক নিয়ে এই ইনস্টিটিউট যাত্রা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ইউএসটিসিতে চিকিৎসা অনুষদের অধীনে ২০১৬-১৭ সেশন পর্যন্ত আইএএইচএস পরিচালিত হলেও ২০১৭-১৮ সেশন থেকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয় প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে আইএএইচএস’র অধীনে প্রতি ব্যাচে ৮০ জন দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। রয়েছে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, ছাত্রাবাস ও ছাত্রীনিবাস।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিক্যাল কলেজ: ২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষে প্রথম ব্যাচে মাত্র ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তির মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিক্যাল কলেজের। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ৫ শতাংশ অর্থাৎ মেধাবী ও অসচ্ছল কোটায় বিনামূল্যে ৬ জন শিক্ষার্থীকে এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয়। ওয়ার্ল্ড ডিরেক্টরি অব মেডিক্যাল স্কুল এবং ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল অ্যাডুকেশন ডিরেক্টরি এই মেডিক্যাল কলেজকে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রতি ব্যাচে ভর্তি করা হয় ১১৫ জন শিক্ষার্থী। ডেন্টাল ইউনিটে বিডিএস কোর্সে আসন ২০টি। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রতিষ্ঠানে এমডি (পেডিয়াট্রিক-রেসিডেন্সি) কোর্স, বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্স (বিসিপিএস) কর্তৃক এফসিপিএস দ্বিতীয় পর্ব পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত এই প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত নার্সিং ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা কোর্সে ৫০ জন এবং ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত নার্সিং কলেজের বিএসসি অনার্স (নার্সিং) কোর্সে ৫০ জন ভর্তি করা হয় প্রতিবছর।
বিজিসি ট্রাস্ট মেডিক্যাল কলেজ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত কার্যকরী মেডিক্যাল স্কুলের ওয়ার্ল্ড ডিরেক্টরিতে তালিকাভুক্ত বিজিসি ট্রাস্ট মেডিক্যাল কলেজ চিকিৎসক তৈরিতে ও চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। চন্দনাইশে স্থাপিত কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০২ সালে। মোট আসন সংখ্যা ১০০টি। যার মধ্যে ৪৫ শতাংশ আসন বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ। এখানে মেডিসিন, পেডিয়াট্রিক, সার্জারি, গাইনি বিষয়ে স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জন দ্বারা স্বীকৃত। রয়েছে শিক্ষার্থীদের হোস্টেল, ক্যান্টিন ও লাইব্রেরি।
চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ: নগরের চান্দগাঁও শমসের পাড়ায় ৬০ হাজার বর্গফুট ফ্লোর স্পেসসহ বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন নিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছে কলেজটি। যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি। প্রতিষ্ঠালগ্নে কলেজে আসন সংখ্যা ছিল ৫০টি, বর্তমানে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৮০টি। কলেজের সব বিভাগ ও অফিস সুসজ্জিত। রয়েছে অত্যাধুনিক ক্লাসরুম, ব্যবহারিক ক্লাস, বইসমৃদ্ধ লাইব্রেরি, কম্পিউটার ল্যাব, গবেষণা ও সেমিনার রুম, ক্যান্টিনসহ সকল সুবিধা। মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থাও করেছে চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ। রয়েছে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেমসহ সুসজ্জিত লেকচার গ্যালারি। শিক্ষকদের গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে স্বতন্ত্র ‘রিসার্চ ডিভিশন’। এফসিপিএস এর ৬টি বিভাগে ট্রেনিং কোর্সের কার্যক্রমও এই প্রতিষ্ঠানে চালু আছে।




