সেই শিশুর চিকিৎসায় ঘাটতি ছিল না, দাবি সাজিনাজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের
চট্টগ্রাম বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার সাজিনাজ হাসপাতালে নবজাতকের ভুল চিকিৎসার অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষিতে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এক বিবৃতিতে শিশুটির প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে বিভ্রান্তি এড়ানোর স্বার্থে ক্লিনিক্যাল তথ্য দিয়েছেন।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, শিশুটি ২৫ মে রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি হয়। সে ছিল ৩৬+ সপ্তাহের Late Preterm নবজাতক, যার জন্মের পর থেকেই শ্বাসকষ্ট ছিল এবং Congenital Pneumonia/Neonatal Respiratory Infection সন্দেহে চিকিৎসাধীন ছিল।
ভর্তির সময় শিশুটি NCPAP respiratory support-এ ছিল এবং পরবর্তীতে অক্সিজেন সাপোর্টেরও প্রয়োজন হয়। ভর্তির সময়ই ডান পায়ের তালুতে কাটা দাগ ও বাম হাতের ওপরের অঙ্গে (arm, forearm ও hand) উল্লেখযোগ্য ফোলা বিদ্যমান ছিল, যা পূর্ববর্তী হাসপাতাল থেকে স্থানান্তরের সময় থেকেই ছিল।
ফোলাটি কাঁধ থেকে হাত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ভর্তির সময় উপস্থিত পিতাকে এই ফোলার বিষয়টি অবহিত করা হয়, দেখানো হয় এবং চিকিৎসা নথিতেও তা লিপিবদ্ধ করা হয়।
পরবর্তী পর্যবেক্ষণে arm ও forearm-এর ফোলা ধীরে ধীরে কিছুটা কমলেও হাতের ফোলা উল্লেখযোগ্যভাবে থেকে যায় এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা হয়।
ভর্তির পর হাসপাতালের প্রটোকল অনুযায়ী বাইরের ক্যানোলা (বাম হাতে) অপসারণ করা হয়, আক্রান্ত অঙ্গ উঁচু করে রাখা হয় এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ শুরু হয়। পরবর্তীতে বাম হাতে আর কোনও ক্যানুলা করা হয়নি এবং ডান হাত ও দুই পায়ে ক্যানুলা করে পরবর্তী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হয়। ভর্তির প্রথম দিন থেকেই বাম হাতের ক্যানুলা ফোলা ও রক্ত সঞ্চালনজনিত জটিলতার সম্ভাবনা বিবেচনায় limb elevation, local anticoagulant therapy (Heparin gel), appropriate dressing (ফোলা জায়গা গরম রাখার প্রেক্ষিতে কাভার করে রাখা) এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়। পরবর্তী পর্যবেক্ষণে arm ও forearm-এর ফোলা ধীরে ধীরে কিছুটা কমলেও হাতের ফোলা উল্লেখযোগ্যভাবে থেকে যায়। ৩০ মে হাতের ফোলা বৃদ্ধি, লালচে ভাব এবং স্থানীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়। সেই অনুযায়ী আক্রান্ত অঙ্গ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং ধারাবাহিকভাবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হয়।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ৩০ মে গভীর রাত থেকে সকালে বাম হাতের কবজির চারপাশে একটি constricting band স্পষ্টভাবে শনাক্ত হয়। একই সময়ে হাতের ফোলা আরও বৃদ্ধি পায় এবং রক্ত সঞ্চালনের অবনতির লক্ষণ ও cyanosis দেখা দেয়। পরিস্থিতির তীব্রতা বিবেচনায় তাৎক্ষণিকভাবে ৩১ মে সকালে Pediatric Surgeon, Vascular Surgeon এবং Pediatric Consultant-এর সমন্বয়ে জরুরি multidisciplinary consultation অনুষ্ঠিত হয়। সকল বিশেষজ্ঞের যৌথ মতামত অনুযায়ী systemic anticoagulation therapy, circulatory support, inotropic support এবং অন্যান্য জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
রোগীর চিকিৎসার পুরো সময়জুড়ে শিশুর অভিভাবকদের প্রতিদিন রোগীর ক্লিনিক্যাল অবস্থা, অগ্রগতি এবং সম্ভাব্য আউটকাম সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। সকল গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, চিকিৎসা সিদ্ধান্ত এবং ঝুঁকি সম্পর্কে নিয়মিতভাবে কাউন্সেলিং ও ব্রিফিং প্রদান করা হয়। সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরিবারকে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত রাখা হয় এবং তাদের সম্মতি ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই চিকিৎসা এগিয়ে নেওয়া হয়। ১ জুন একাধিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শক্রমে কবজির constricting band অপসারণ এবং হাতের ওপর থাকা চাপ কমানোর উদ্দেশ্যে জরুরি fasciotomy করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্তের আগে সার্জন কর্তৃক রোগীর অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্রিফিং প্রদান করা হয় এবং হাতের ক্লিনিক্যাল অবস্থা ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অভিভাবকদের সরাসরি দেখানো ও ব্যাখ্যা করা হয়। পরিবারের সম্মতির পর যথাযথ aseptic precaution গ্রহণ করে fasciotomy সম্পন্ন করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল রক্ত সঞ্চালন পুনঃপ্রবাহ (re-establishment of blood circulation) নিশ্চিত করা। প্রক্রিয়ার পরপরই হাতের রঙ ও পারফিউশনে উন্নতি লক্ষ্য করা যায়।
‘পরবর্তীতে রোগীর অবস্থা বিবেচনায় উন্নততর ব্যবস্থাপনার জন্য রোগীকে ঢাকা-ভিত্তিক একটি উচ্চতর কেন্দ্রে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত রোগীর পরিবার ও চিকিৎসক দলের সম্মিলিত আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রোগীকে রেফার করা হয়, কিন্তু রেফারকৃত হাসপাতালে না গিয়ে অন্য হাসপাতালে গিয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট করেন। পরবর্তীতে চিকিৎসা চলাকালীন অবস্থায় ৪ দিন পরে শিশুটির মৃত্যু ঘটে। পরবর্তী কেন্দ্রের চিকিৎসা সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল বিবরণ আমাদের প্রতিষ্ঠানের নিকট উপলব্ধ নয়। আমরা গভীরভাবে দুঃখিত যে শিশুটিকে শেষ পর্যন্ত আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি’।
‘একইসঙ্গে এটিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, রোগী আমাদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ধারাবাহিক নিবিড় পর্যবেক্ষণ, সময়মতো চিকিৎসা হস্তক্ষেপ, একাধিক বিশেষজ্ঞের সমন্বিত পরামর্শ এবং জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা যথাসময়ে প্রদান করা হয়েছে। উপলব্ধ চিকিৎসা নথি অনুযায়ী চিকিৎসক দল সর্বোচ্চ পেশাগত সতর্কতা, আন্তরিকতা এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে চিকিৎসা পরিচালনা করেছে। এযাবত কালে সাজিনাজ হসপিটালের শিশু বিভাগ চার হাজারের বেশি গুরুতর অসুস্থ বাচ্চাকে সফলতার সাথে চিকিৎসা প্রদান করে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা বজায় রাখার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমরা মরহুম শিশুটির বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি আন্তরিক ও গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি’।




