আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসায় মেডিকেল ফিজিসিস্টের অবদান
এক্স-রে থেকে রেডিওথেরাপি
আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসায় মেডিকেল ফিজিসিস্টের অবদান
মো. আবু কাওসার
১৮৯৫ সালে স্যার উইলিয়াম কনরাড রন্টজেন যখন এক্স-রে আবিষ্কার করেছিলেন, তখন তিনি হয়তো ভাবেননি যে, তার এ আবিষ্কার আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানকে কতটা গভীরভাবে আলোড়িত করবে। মানবদেহের ভেতরে হাড় দেখতে সক্ষম এক রহস্যময় রশ্মি কীভাবে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়েছে যাকে আমরা আজকের দিনে রেডিওথেরাপি নামে জানি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ক্যান্সার রোগীদের ৫০% এর বেশি চিকিৎসার অংশ হিসেবে কোনো না কোনোভাবে রেডিওথেরাপি প্রয়োজন; যা প্রায় সব ধরনের ক্যান্সার যেমন স্তন, মস্তিস্ক, জরায়ুমুখ, পায়ুপথ এবং ফুসফুসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। তা স্বত্তেও বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে রেডিওথেরাপির চিকিৎসা এখনো অপর্যাপ্ত । অন্যদিকে আইএইএ-র পরিসংখান বলছে, পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দেশ এখনও রেডিওথেরাপি সুবিধাবঞ্ছিত, যার মধ্যে ২৮টি দেশ আফ্রিকায়।
রেডিওথেরাপি একটি দলগত চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে ডাক্তারদের (রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট) পাশাপাশি, মেডিকেল ফিজিসিস্টরা এর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেন। দৈনন্দিন চিকিৎসার সময় রোগীরা তাদের না দেখলেও মেডিকেল ফিজিসিস্টরা, বিকিরণ ও মানব শরীরের সঙ্গে এর বিক্রিয়া এবং ক্যানসারের চিকিৎসায় এর প্রয়োগ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ। তারা উন্নত ক্যানসার চিকিৎসায় বিকিরণ প্রযুক্তি ও পদ্ধতি প্রয়োগ, বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোত্তম চিকিৎসার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি রোগী এবং কর্মীদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
সহজ কথায়, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট যেখানে সিদ্ধান্ত নেন একজন রোগীর কতটুকু রেডিয়েশন প্রয়োজন, সেখানে মেডিকেল ফিজিসিস্ট, এ ডোজ সঠিকভাবে নির্ধারণ এবং প্রয়োগ করে থাকেন। তারা লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটরের মতো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির পরীক্ষণ, ক্যালিব্রেশন এবং গুণমান নিশ্চিতকরণের দায়িত্বে থাকেন। যেহেতু সামান্য ত্রুটি টিউমারে কম ডোজ বা সুস্থ টিস্যুতে বেশি ডোজ প্রদানের কারণ হতে পারে, তাই রেডিওথেরাপির নির্ভুলতা এবং রোগী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মেডিকেল ফিজিসিস্টের ভূমিকা অপরিহার্য।
রন্টজেন’র এক্স-রে আবিষ্কার থেকে আধুনিক রেডিওথেরাপি পর্যন্ত যাত্রা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির এক উল্লেখযোগ্য ইতিহাস। প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছিলেন এক্স-রে এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থ, যা রোগাক্রান্ত টিস্যু ধ্বংস করতে পারে, তারই ধারাবাহিকতাই পরবর্তীতে রেডিয়েশন থেরাপির জন্ম হয়। সময়ের পরিক্রমায় এই প্রযুক্তি রেডিয়ামের অপরিশোধিত প্রয়োগ থেকে উন্নত হয়ে মিলিমিটার নির্ভুলতায় টিউমার ধ্বংস করতে সক্ষম অত্যাধুনিক কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায়, মেডিকেল ফিজিসিস্টের কাজ সাধারণ রেডিয়েশন পরিমাপ থেকে জটিল চিকিৎসা পরিকল্পনা ও আধুনিক পদ্ধতি যেমন ইনটেনসিটি-মডুলেটেড রেডিওথেরাপি (IMRT), ভলিউমেট্রিক মডুলেটেড আর্ক থেরাপি (VMAT), এবং ইমেজ-গাইডেড রেডিওথেরাপি (IGRT)-এর মতো আধুনিক কৌশলগুলি উন্নত কম্পিউটার হিসাব এবং ইমেজিং সিস্টেমের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। আর এসবের জন্য প্রয়োজন দক্ষ মেডিকেল ফিজিসিস্টের, যাতে প্রতিটি চিকিৎসা রোগীর প্রয়োজন এবং টিউমারের অবস্থান অনুযায়ী সঠিকভাবে প্রদান করা হয়।
দিনদিন বাংলাদেশে মেডিকেল ফিজিসিস্টের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ ক্যান্সারের রোগী দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে বার্ষিক প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৬ জন মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হন; যা জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার পরিবর্তনসহ নানাবিধ কারণে ক্রমাগত বাড়ছে। দুর্ভাগ্যবশত, অনেক মানুষ এখনও সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার সুযোগ পান না। রেডিওথেরাপি, যা সবচেয়ে কার্যকর ক্যানসার চিকিৎসা পদ্ধতির একটি; তা অনেক রোগীর নাগালের বাইরে, কারণ দেশে চিকিৎসা কেন্দ্র এবং প্রশিক্ষিত পেশাদারের সংখ্যা এখনো অপর্যাপ্ত।
ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ ২০২৪ এ প্রকাশিত, একটি গবেষণায় বিভিন্ন দেশে রেডিওথেরাপি পেশাদারদের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৬০ জন রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, ৫০ জন মেডিকেল ফিজিসিস্ট এবং ১২০ জন রেডিয়েশন থেরাপিস্ট রয়েছেন। ২০২২ সালে এই বিশেষজ্ঞ দলের প্রয়োজনীয় সংখ্যা ছিল ৪২৮, ২৩৮ এবং ৭১৪ জন। তবে ২০৫০ সালের দিকে ক্যান্সার চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে এই প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে যথাক্রমে ৮৯০, ৪৯৫ এবং ১,৪৮৪ জনে পৌঁছাবে। এটি ২০২২ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ২৬৮ জন রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, ১৮৮ জন মেডিকেল ফিজিসিস্ট এবং ৫৯৪ জন রেডিয়েশন থেরাপিস্টের একটি উদ্বেগজনক ব্যবধান প্রতিফলিত করে, যা বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য রেডিওথেরাপি পেশাদারদের উন্নয়নে কৌশলগত পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়।
বাংলাদেশে মেডিকেল ফিজিসিস্টের অপ্রতুলতার পাশাপাশি এই ক্ষেত্রটি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জেরও সম্মুখীন। মেডিকেল ফিজিসিস্টদের ভূমিকা সম্পর্কে সচেতনতা এখনও সীমিত। অনেকেই এখনও বিশ্বাস করেন যে শুধুমাত্র ডাক্তাররা ক্যানসার চিকিৎসায় প্রধান ভূমিকা পালন করেন, কিন্তু রেডিওথেরাপি যে একটি দলগত প্রচেষ্টা যেখানে ফিজিসিস্ট ও রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্টদের অবদান অনস্বীকার্য তা অনেকেই জানেন না। বাংলাদেশে প্রশিক্ষিত মেডিকেল ফিজিসিস্টদের সংখ্যা এখনও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে আধুনিক সরঞ্জাম এবং রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তার ঘাটতিও এই পেশার অন্যতম চ্যলেঞ্জ। কিছু হাসপাতাল এখনও পুরোনো রেডিওথেরাপি যন্ত্র পরিচালনা করে, যেখানে প্রতিস্থাপন যন্ত্রাংশ দুষ্প্রাপ্য এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও অনেক বেশি। এমন পরিস্থিতিতে, মেডিকেল ফিজিসিস্টরা সৃজনশীলতা ব্যবহার করে যন্ত্রগুলিকে কার্যকর এবং স্থানীয় উদ্ভাবন কাজে লাগিয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকে পালন করতে পারেন, যা রোগীদের এবং দেশের ক্যান্সার চিকিৎসার অগ্রগতির প্রতি তাদের গভীর প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত করবে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে অবশ্যই ক্যানসার চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য মেডিকেল ফিজিক্স পেশাকে শক্তিশালী করার ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়ন, শিক্ষা এবং ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্প্রসারণ, মানসম্মত সার্টিফিকেশন সিস্টেম প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি ও বেসরকারি উভয় সেক্টরে ফিজিসিস্টদের জন্য ন্যায্য ক্যারিয়ারের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা। সরকারি ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যারা দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে মেডিকেল ফিজিসিস্টদের প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে দেশে ক্যানসার চিকিৎসার মান উন্নয়ন করতে হবে। স্থানীয় গবেষণা এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কম খরচে মান নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম, ডেটা ব্যবস্থাপনা সিস্টেমসহ অনান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যা বাংলাদেশে সীমিত-সম্পদ পরিস্থিতিতেও রেডিওথেরাপিকে আরও সুলভ এবং দক্ষ করে তুলতে পারে।
এ পেশাকে জনসচেতনতাই সম্পৃক্ত করাটাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ- একজন ক্যানসার রোগী যখন রেডিওথেরাপি চিকিৎসা নেন, তখন একটি বিশেষজ্ঞ দল কাজ করেন যেখানে মেডিকেল ফিজিসিস্টসহ প্রত্যেকেই চিকিৎসা নিরাপদ এবং সফল হওয়া নিশ্চিত করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।
সুতরাং, দেশ যখন স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি এবং ক্যানসারের বিরুদ্ধে আরও কার্যকরভাবে লড়াই করার চেষ্টা করছে, তখন মেডিকেল ফিজিসিস্টর স্বীকৃতি এবং ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার ভবিষ্যৎ শুধুমাত্র নতুন যন্ত্র বা ওষুধের ওপর নির্ভর করে না বরং বিজ্ঞান এবং মানবতার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা দক্ষ মেডিকেল ফিজিসিস্টর ওপরও নির্ভর করে।
লেখক: সিনিয়র মেডিকেল ফিজিসিস্ট, ক্লিনিক্যাল অনকোলজি ও মেডিকেল ফিজিক্স বিভাগ, ডেল্টা হাসপাতাল লিমিটেড




