আদ্-দ্বীন হাসপাতালে শিশুমৃত্যু : তদন্ত রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ডা. লেলিন
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের শিশুমৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটির রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী। শুক্রবার (৫ জুন) রাত ১০টার দিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালে গত ২৭ মে রাতে ৬ জন সুস্থ শিশুর আকস্মিক মৃত্যুতে দেশ আলোড়িত হয়। বেদনাদায়ক এই ঘটনার তদন্তে গঠিত কমিটির রিপোর্ট আমরা পেয়েছি।
সেখানে শিশুমৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বলা হয়েছে— ‘‘ছোট কক্ষে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকায় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, যা নবজাতক শিশুর দীর্ঘসময় টিকে থাকার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।’’
তিনি আরও বলেন, তদন্ত কমিটি অবশ্য শুরুতেই বলেছে– ময়নাতদন্ত ছাড়া মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করা সম্ভব নয়, তাই পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য শুনে তারা মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ নির্ধারণ করেছে।
এরকম পদ্ধতিতে ‘মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ’ কি বিজ্ঞানসম্মত?
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ফরেনসিক মেডিসিনে ‘একই অবস্থা তৈরিকরণ’ নামে একটি পদ্ধতি রয়েছে। আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনাস্থলে (অকুস্থলে) অর্থাৎ শিশু পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড-০২-এ আগে যত সময় এসি বন্ধ ছিল তত সময় বন্ধ রেখে, ভেতরে সমসংখ্যক মানুষ রেখে (অবশ্যই নবজাতক বা শিশু নয়) কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা একনাগাড়ে পরিমাপ করা।
যদি দেখা যায় কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে তাহলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের বিষক্রিয়াজনিত কারণে শিশুমৃত্যু ঘটেছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। যতদূর জানা গিয়েছে ‘একই অবস্থা তৈরিকরণ’ পদ্ধতি আদ্-দ্বীন হাসপাতালে প্রয়োগ করা হয়নি। তাহলে প্রশ্ন আসে– একেবারে অনুমানভিত্তিক সিদ্ধান্ত কি সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে?
ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, আমরা জানি– বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের স্বাভাবিক মাত্রা হলো ০.০৪% (৪০০-৪৫০ পিপিএম)।
সহনশীলতার মাত্রা ০.৫% (৫,০০০ পিপিএম), এই মাত্রা পর্যন্ত মানুষ শ্বাস নিতে এবং সুস্থ থাকতে পারে।
বিপজ্জনক মাত্রা ৭-১০% (৭০,০০০-১,০০,০০০ পিপিএম), এ পর্যায়ে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, অসুস্থ বোধ করে, মাথা ঘোরানো ও বমি হয় এবং জ্ঞান হারায়। এরপর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ এক লাখ পিপিএমের বেশি হলে মানুষ শ্বাস নিতে পারে না এবং দ্রুত মৃত্যুবরণ করে।
তিনি বলেন, আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে, কার্বন মনোক্সাইড দ্বারা বিষক্রিয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল কি? তদন্ত কমিটি কি সেটা বিশ্লেষণ করে দেখেছে? মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে পোস্টমর্টেম করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাদি সম্পন্ন করা।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান, আদ্-দ্বীন হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর জন্য দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকাসহ দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ওই কক্ষটি প্রায় ৯০০ বর্গফুট, যেখানে ১১ জন নবজাতক এবং রোগীর লোকসহ প্রায় ৫০ জনের উপস্থিতি ছিল, যা ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। তদন্ত কমিটি হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রমাণ পেয়েছে যে, বিদ্যমান প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিবর্গ একটি হাসপাতাল পরিচালনার প্রাথমিক শর্তাবলি পালনে সক্ষম ছিল না। পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড-২ এ ভর্তি রোগীদের দেখাশোনার জন্য কোনো চিকিৎসক ছিল না। পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড-২ এ দায়িত্বরত সেবিকাদের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়নি। পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড নাম্বার-২ এ আলো বাতাস চলাচলের ভেন্টিলেশনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। পোস্ট অপারেটিভ কক্ষে রোগী, নবজাতক রোগীর অ্যাটেন্ডেন্টসহ অতিরিক্ত সংখ্যক জনবলের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি।
তিনি বলেন, হাসপাতালটির ভিতরে যত্রতত্রভাবে কাঁচের ছোট ছোট কক্ষ নির্মাণের ফলে হাসপাতালটি যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ প্রতীয়মান হয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তদন্ত কমিটি মনে করে, ভবিষ্যতে বেসরকারি হাসপাতালের নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল পরিচালনায় ব্যবহৃত ভবন পরিদর্শনপূর্বক পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক হিসেবে শর্তারোপ করা প্রয়োজন।
ছয় শিশুর মৃত্যুর যে কারণ তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে তা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, যদিও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত ছাড়া মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ বের করা সম্ভব নয়, তথাপি পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ, বিভিন্ন ব্যক্তিদের বক্তব্য ও জবানবন্দি থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ছোট বদ্ধ কক্ষে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকায় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, যা নবজাতক শিশুর দীর্ঘ সময় টিকে থাকার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
এর আগে গত ২৭ মে ভোরে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। স্বজনদের অভিযোগ, ওয়ার্ডে অব্যবস্থাপনা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা (এসি) বন্ধ থাকার কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে।
মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের জন্য পৃথকভাবে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ঘটনার পরপরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও পৃথকভাবে তিন সদস্যের আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়াও আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ কোনো ত্রুটি বা অবহেলা ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে হাসপাতালটির নিজস্ব একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।




