ভয়ংকর রূপ দেখাতে পারে ডেঙ্গু
চলতি বছর মৌসুম শুরুর আগেই চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। হুট করে বৃষ্টি আর ভ্যাপসা গরমে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশা। রাজধানী থেকে এখন গ্রামে-গঞ্জে সবখানে ডেঙ্গুর প্রকোপ সমান্তরাল। রাজধানীর বাইরে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু হচ্ছে বরিশাল ও খুলনা বিভাগে। এসব এলাকার কয়েকটি জেলা শহরে ডেঙ্গুর হটস্পট চিহ্নিত হয়েছে। দুই যুগের বেশি সময় ঢাকা থেকে দেশের প্রতিটি জেলায় ডেঙ্গু বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সরকার বাহারি উদ্যোগ নিলেও তা কাজে আসছে না। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ডেঙ্গুতে ১৩ জনের প্রাণ গেছে। এ সময় রোগটি শনাক্ত হয়েছে প্রায় ছয় হাজার মানুষের শরীরে। যাদের অধিকাংশ রাজধানীর বাইরের বাসিন্দা। গত বছর দেশে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এ সময় রোগটিতে মারা যান ৪১৩ জন।
গত বছরের নভেম্বরে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) একটি জরিপে দেখা যায়, বরগুনাসহ কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের বড় পাত্র থেকে এডিস মশা, পানির সংকটের কারণে বংশবিস্তারে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে। ২০২৩ সালে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গিয়েছিল। গত বছর আইইডিসিআরের কীটতাত্ত্বিক জরিপে দেখা যায়, ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে ঝিনাইদহ, মাগুরা, পিরোজপুর ও পটুয়াখালীর পৌরসভা এলাকা।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় গত ২ জুন এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশের সব বেসরকারি হাসপাতালে ১০ শতাংশ বেড ফাঁকা রাখতে হবে। পাশাপাশি ডেঙ্গুর টেস্টে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিতে হবে। শুধু ওষুধ ও খাবারের খরচ রোগী বহন করবে। ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পরামর্শ ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করতে হবে।
তবে কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে। এর মধ্যে আবার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মৃত্যুর হার তুলনামূলক বেশি। অতীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বয়ে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে প্রাক-বর্ষায় এডিস মশার লার্ভা জরিপ পরিচালনা করা হতো। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ থাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা এবার কোনো জরিপ পরিচালনা করেনি। তবে প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) প্রাক-বর্ষায় এডিস মশার লার্ভা জরিপ পরিচালনা করেছে। সেখানে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো জরিপের তথ্যকে সামনে রেখে মশক নিধনে কাজ করবে বলে জানা গেছে।
কীটতত্ত্ববিদরা বলেছেন, এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগস্ট বা সেপ্টেম্বরে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে এবং তা ভয়াবহ হতে পারে। আগামী এক মাসের মধ্যে এডিসের বংশবিস্তার রোধ করতে হবে। এসময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কমিউনিটি মোবিলাইজেশন জরুরি।
সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কর্মসূচি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এডিস মশার প্রজনন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বহুতল ও নির্মাণাধীন ভবনে এডিস নিয়ন্ত্রণে রিহ্যাব এবং ফ্ল্যাট মালিক সমিতির মাধ্যমে বছরব্যাপী জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম পরিচালনা এবং এডিস মশার উচ্চ ও মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বছরব্যাপী ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘ উষ্ণ সময়কাল এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে এখন ডেঙ্গুর মৌসুমি ধারা বদলে যাচ্ছে। সংক্রমণ আগেভাগে শুরু হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘ডেঙ্গু একবার কোনো এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তা ধীরে ধীরে ‘এপিডেমিক সাইকেল’ অনুযায়ী বাড়ে এবং একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে গিয়ে কমতে শুরু করে। ডেঙ্গুর বিস্তার মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে—ভাইরাস, বাহক মশা এবং সংবেদনশীল মানুষ। ঢাকায় দীর্ঘদিন ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থাকায় এখানে ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ এরই মধ্যে কোনো না কোনোভাবে সংক্রমিত হয়েছে। ফলে এখানে সংক্রমণের হার এখন কিছুটা কমতির দিকে।’
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ: গত ১০ বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের বিস্তার রোধে খরচ করেছে অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা। নগরবাসীর অভিযোগ, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। তাদের ভূমিকা দৃশ্যমান তো নয়ই, প্রশ্নবিদ্ধও বটে।
সিটি করপোরেশন কী কাজ করছে : ঢাকা দক্ষিণে ৭৫টি এবং ঢাকা উত্তরে ৫৪টি ওয়ার্ড। দুই সিটি করপোরেশন মিলে নগরীতে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ মানুষ বাস করে বলে ২০২২ সালের ২৭ জুলাই প্রকাশিত জনশুমারিতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন বলেছে, ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখ। জনসংখ্যা যাই হোক, নগরবাসীকে মশার উপদ্রব থেকে রক্ষার দায়িত্ব ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের। এ দুটি সংস্থা মশা নিধনে সকালে নালা, ঝিল বা খালে লার্ভিসাইড এবং বিকেলে অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগ করে। উত্তর সিটিতে মশা নিয়ন্ত্রণে কারিগরি কমিটি, স্পেশাল টাস্কফোর্স কমিটি, ওয়ার্কিং কমিটি, ওয়ার্ড লেভেল কমিটি, এখন আবার নতুন কীটনাশকের গুণাগুণ যাচাইয়ের জন্য কমিটি করেছে। একইভাবে দক্ষিণ সিটিতেও করা হয়েছে কয়েকটি কমিটি। এমনকি মশার ওষুধ কাজ করছে কি না, তা নিয়েও কমিটি গঠন করা হয়েছে।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে মশক নিধন কার্যক্রম তদারকি করতেন কাউন্সিলর ও মেয়ররা। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর তারা সবাই আত্মগোপনে চলে গেছেন। ফলে মাঠ পর্যায়ে জবাবদিহির জায়গা নেই। নাগরিকদের ভোগান্তির বিষয়েও কারেও কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন না নাগরিকরা।
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলামের দাবি, ‘মশা বেড়ে গিয়েছিল, আমাদের মনিটরিং টিমটা, আমাদের কর্মকর্তা দিয়ে আমরা ইনশাআল্লাহ মোটামুটি এখন ভালো কমাতে পেরেছি।’
ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওষুধের কার্যকারিতা ঠিক আছে। আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয় ওষুধ চেক করার সময় দেখেছেন, ওষুধের কার্যকারিতায় সমস্যা নাই। সমস্যা হলো ব্যবহার, মানে প্রয়োগের ক্ষেত্রে। কীভাবে আমরা ব্যবহার করছি, ওইটা হলো সমস্যা। ফগিংটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা একটু মনোযোগ দিচ্ছি, তারা যেন একটা ভালোভাবে ব্যবহার করে। এজন্য মনিটরিং টিমটা আমরা দিয়েছি। অনেকটাই মশা কমেছে।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মাহমুদা আলী বলেন, ‘আমাদের উত্তর এলাকায় বস্তি বেশি, ঝিল বেশি, পুকুর-খাল বেশি, জলাশয়ও বেশি। যার কারণে কচুরিপানাও বেশি। এখানে বস্তি অনেক থাকায় টং ঘরে যারা থাকে, সেখানে নিচে সব ময়লা ফেলে। আমরা হটস্পটগুলো নির্দিষ্ট করে কাজ করছি। আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করে যাচ্ছি, বিশেষ প্রোগ্রাম করছি।’ তার দাবি, ‘প্রতি শনিবার আমাদের যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, যে ক্লিনিং প্রোগ্রাম এটা করছি। সব কিছু মিলিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণে আছে।’
মশক নিধন কর্মীদের কাজে গাফিলতি: সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটির বকশীবাজার, পলাশী, আজিমপুর, নিউ মার্কেট এলাকার মূল সড়ক ও বিভিন্ন গলিতে ঘুরে মশক নিধন কর্মী দেখা যায়নি। যদিও গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি মশার ওষুধে কাজ হচ্ছে কি না, তা যাচাই করার জন্য একটি কমিটি করেছিল ডিএসসিসি। এ কমিটি মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে ওষুধে মশা মরছে কি না, তা দেখার কথা। একই সঙ্গে মশা নিধনে নিয়োজিত কর্মীরা ঠিকমতো কাজে যাচ্ছেন কি না, সেটিও যাচাই করার কথা এই কমিটির। কিন্তু মশা নিধনের কাজে নিয়োজিত কিছু কর্মী রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন খোদ ডিএসসিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা।
ডিএসসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে জানা যায়, মশা নিধনের কাজে এখন ১ হাজার ৩০ জন কর্মী নিয়োজিত আছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ওয়ার্ডে সকালে সাতজন ও বিকেলে ছয়জন কর্মী মশার ওষুধ ছিটানোর কথা। ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে এ সিটিতে মশক নিধন কর্মী আছেন ১১১৪ জন।
বকশীবাজারের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘আগে প্রতিদিন দুবার মশা মারার জন্য আসতো। ছয় সাত দিন আগে একবার দেখছি, কয়দিন ধরে আসে না।’
বাসাবো এলাকার বাসিন্দা খোরশেদ আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের লোকজনকে নিয়মিত দেখা যায় না। মাঝে মাঝে তারা এলাকায় এসে ওষুধ স্প্রে করলেও তা নিয়মিত নয়।’ একই অভিজ্ঞতা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বাসিন্দাদের কারও কারও। মিরপুরের আহমদনগরের একজন বাসিন্দা বলেন, ‘গেল ১৫ দিনেও তিনি বিকেলে মশার ওষুধ ছিটাতে দেখেননি।’
গত মঙ্গলবার মহাখালী ও বনানী এলাকা এলাকা ঘুরে মশার ওষুধ ছিটাতে দেখা যায়নি। তিতুমীর কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আগে প্রতিদিন মশার ওষুধ দিত, কয়েক মাস ধরে চার পাঁচদিন পর পর আসে। গত সোমবার বিকেলে দেখেছি, এর পরে আর খবর নাই।’
রামপুরা হাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা শাকিল পারভেজ বলেন, কালেভদ্রেও মশককর্মী চোখে পড়ে না। আগে তো কিছু হলে কাউন্সিলরকে বলতে পারতাম, অভিযোগ জানাতে পারতাম। কিন্তু এখন বলব কাকে? সরকারি কর্মকর্তাদের তো ভাবই আলাদা।
মশার পেটে হাজার কোটি টাকা: ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত গত ১০ অর্থবছরে ডিএনসিসি মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করেছে ৬৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। আর ডিএসসিসি ব্যয় করেছে ৩২৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
২৭ বছর ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বাজেট ও ব্যয় বাড়লেও এটি নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে মূলত দুটি বড় ‘গ্যাপ’ বা ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন ডিএসসিসির উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন। তিনি বলেন, ‘প্রথমত, ডেঙ্গুবিরোধী নিবিড় কার্যক্রম কেবল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকে, যা সারা দেশের অন্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোয় সমভাবে হচ্ছে না। ফলে ঢাকায় ডেঙ্গু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও ঢাকার বাইরে সারা দেশে এর প্রকোপ বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, সিটি করপোরেশন রাস্তাঘাট বা বাড়ির আশেপাশে ওষুধ ছেটাতে পারলেও ঘরের ভেতরে গিয়ে কাজ করতে পারে না; অথচ এডিস মশা ও লার্ভা সবচেয়ে বেশি জন্মায় ঘরের ভেতরেই। বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরীক্ষিত মশার ওষুধ শতভাগ কার্যকর হলেও তা কেবল বাইরের মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। তাই ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে শুধু সরকারের ওপর ভরসা না করে জনসচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ উদ্যোগে সচেতন হতে হবে এবং নিজ ঘরে বা আশেপাশে কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। পানি পরিষ্কার রাখলে মশার ডিম থেকে লার্ভা হতে পারবে না, ফলে মশার বংশবৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব হবে। মূলত সারা দেশে একইভাবে ডেঙ্গুবিরোধী কাজ পরিচালনা করা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল ডেঙ্গুমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব।’
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পিত নগরায়ণ দরকার। ডেঙ্গু প্রতিরোধে যতক্ষণ পর্যন্ত একটি নগর পরিকল্পনা এবং জৈবিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় না হবে ততক্ষণ শুধু কেমিক্যাল দিয়ে ফগিং করে কোনো লাভ হবে না।’
ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বলেন, মশা নিধনের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ডিএসসিসির নিজস্ব জরিপে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোয় রোববার থেকে এক সপ্তাহের বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ শুরু হয়েছে।
ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ডিএনসিসির চারটি সোসাইটির সমন্বয়ের মাধ্যমে নগরবাসীর সহযোগিতায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। এর আগে সোসাইটির সহযোগিতায় আমরা কোরবানির বর্জ্য অপসারণসহ নানা কাজে সফলতা পেয়েছি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে জাতীয় কমিটি ও টাস্কফোর্স: ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্য রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ বিষয়ক জাতীয় কমিটি’ পুনর্গঠন করেছে সরকার। সিটি করপোরেশন এলাকাসহ দেশের যেসব স্থানে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বা শঙ্কা রয়েছে, সেখানে এই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হবে। এদিকে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের তত্ত্বাবধানে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্সটি মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম তদারকি, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে। গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় কমিটির প্রথম সভা হয়। সভায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, জনগণের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২৭ ওয়ার্ড: ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।




