শিরোনাম

Space for ads

সবার চোখের সামনে কিডনি কেনাবেচার জমজমাট হাট!

 প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬, ০৯:০১ পূর্বাহ্ন   |   অন্যান্য

সবার চোখের সামনে কিডনি কেনাবেচার জমজমাট হাট!
Space for ads
‘ইমার্জেন্সি এ-পজিটিভ লাগবে, পাসপোর্ট থাকতে হবে’, ‘হিন্দু ও-নেগেটিভ লাগবে’— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন পোস্ট দেখে প্রথমে মনে হতে পারে জরুরি রক্তের প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে এগুলো রক্ত নয়, বরং মানব অঙ্গ বা কিডনি কেনা-বেচার নিষিদ্ধ ও গোপন বিজ্ঞাপন।


আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে খোলাখুলিভাবে চলছে মানব অঙ্গের এই অবৈধ বাণিজ্য। দেশের দরিদ্র মানুষকে লক্ষ্য করে একটি আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই চক্র অসহায় মানুষকে ফুসলিয়ে পাকিস্তানে পাঠিয়ে কোটি টাকার কিডনি ব্যবসা চালাচ্ছে। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো— এই অবৈধ বাণিজ্যে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের যোগসাজশ বা সহায়তার গুরুতর অভিযোগও উঠেছে।

মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন অনুযায়ী, পরিবারের সদস্যদের বাইরে কারও সঙ্গে কিডনি বা অন্য কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইনের এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ফেসবুকের বিভিন্ন ক্লোজড গ্রুপে প্রকাশ্যেই চলছে কিডনি বিক্রির অবৈধ ব্যবসা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেসবুকে ‘কিডনি ডোনার গ্রুপ’, ‘কিডনি বিক্রি গ্রুপ’, ‘কিডনি ক্রয়-বিক্রয় গ্রুপ’, ‘কিডনি ডোনার ও প্রতিস্থাপন গ্রুপ’, ‘কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট’, ‘কিডনি ডোনার হেল্প সেন্টার’সহ অর্ধশতাধিক ক্লোজড গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপের কয়েকটিতে সদস্য সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি ওপেন গ্রুপগুলোতেও প্রতিদিন শত শত বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই ঘটছে।

কিডনি ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে একজন সুস্থ ব্যক্তির কিডনি পরিবারের বাইরে কাউকে দেওয়ার জন্য গ্রহীতাকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়। তবে, রক্তের গ্রুপ যদি পজিটিভ হয় তবে এই দর প্রযোজ্য হয়। নেগেটিভ রক্তের গ্রুপের ক্ষেত্রে এই দাম এক কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।

অথচ এই অবৈধ বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিডনিদাতা। তার ভাগ্যে জোটে মাত্র চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। এর বিনিময়ে তাকে আজীবন পঙ্গুত্বের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচতে হয়। এই অসহায় মানুষগুলো অর্থের প্রলোভনে পড়ে নিজের মূল্যবান অঙ্গ হারাচ্ছেন, অন্যদিকে অসাধু চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

ছায়ার আড়ালে কিডনি পাচার চক্র: তিন স্তরের সুসংগঠিত অপরাধ

প্রথম স্তরে সক্রিয় থাকে এলাকাভিত্তিক ও ফেসবুকভিত্তিক মাঠকর্মী। চক্রে তাদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘এজেন্ট’। তাদের প্রধান কাজ হলো অভাবগ্রস্ত ও ঋণগ্রস্ত মানুষকে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে কিডনি বিক্রিতে রাজি করানো। তারা কিডনিদাতাকে পাকিস্তানে থাকা-খাওয়া, হাতখরচ এবং দেশে তার পরিবারের দেখভালের মতো রঙিন স্বপ্ন দেখায়। প্রতিটি কিডনি দাতার জন্য এই এজেন্টরা প্রায় তিন লাখ টাকা পায়। তবে, রক্তের গ্রুপ ‘নেগেটিভ’ হলে কমিশনের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। বাংলাদেশে এমন প্রায় ৫০০ এজেন্ট সক্রিয় রয়েছে, যাদের অধিকাংশই জয়পুরহাটসহ উত্তরবঙ্গের মানুষকে টার্গেট করে। তারা যোগাযোগের জন্য শুধুমাত্র হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে এবং তাদের ফোন নম্বর সবসময় বন্ধ থাকে।

কিডনি ক্রয়-বিক্রয় চক্রের বিভিন্ন মামলার নথি ঘেটে দেখা যায়, দ্বিতীয় স্তরের সিন্ডিকেট মূলত দাতা ও গ্রহীতার পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকিট প্রসেসিংয়ের কাজ করে। চক্রে তাদের বলা হয় ‘ফিক্সার্স’। আগে ভারতের দিল্লি, ব্যাঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ের ক্লিনিকে ট্রান্সপ্লান্ট হতো, কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতির কারণে ভারতের ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে চক্রটি এখন পাকিস্তানের করাচিকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে। তারা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সরাসরি ফ্লাইটে করাচি পাঠানোর ব্যবস্থা করে। ভুক্তভোগী যেন মাঝপথে পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে না পারে, সেজন্য কিডনিদাতা, তার বাবা-মা এবং স্বামী-স্ত্রীর মূল এনআইডি কার্ড রেখে দেয়। তথ্য ফাঁস করলে বা অবাধ্য হলে কার্ড আটকে রেখে ব্ল্যাকমেইল করার হুমকি দেয়। এই স্তরের দালালরা প্রতিটি কিডনির জন্য পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।

সিন্ডিকেটের তৃতীয় স্তরের সদস্যরা অবস্থান করে পাকিস্তানে। তাদেরকে বলা হয় ‘রানার্স’। তারা করাচি বিমানবন্দরে কিডনিদাতাদের রিসিভ করে সরাসরি নিরাপদ আস্তানায় নিয়ে যায়। এই স্তরের স্থানীয় এজেন্টরা জনপ্রতি এক লাখ টাকা পায়।

তবে, আন্তর্জাতিক কিডনি পাচার চক্রের সবচেয়ে বড় অঙ্কের টাকার লেনদেন হয় পাকিস্তানে অবস্থানরত চক্রের মূল হোতার হাতে, যাকে ‘কিংপিন’ বলে ডাকা হয়। ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধানে এই চক্রের ভয়াবহ কার্যপ্রণালী এবং নেপথ্যের কুশলী ব্যক্তিদের তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

এই ‘কিংপিন’রা কালোবাজারে কিডনির ক্রেতা সংগ্রহ করে এবং কোন ব্ল্যাড গ্রুপের কতটি কিডনি প্রয়োজন, তা বাংলাদেশের নেটওয়ার্ককে জানিয়ে দেয়। এরপর বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধনাঢ্য রোগীদের করাচির ছোটখাটো ক্লিনিকে এনে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিটি কিডনি বিক্রির বিনিময়ে এই চক্র ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো— এই আন্তর্জাতিক কালোবাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ কিডনিই আসছে বাংলাদেশিদের শরীর থেকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে সক্রিয় একাধিক কিংপিনের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন নুরুজ্জামান। গ্রেপ্তার হওয়া অনেক আসামিই জিজ্ঞাসাবাদে তার নাম বলেছেন। বাংলাদেশের অধিকাংশ এজেন্ট এই নুরুজ্জামানের সঙ্গেই হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ রাখে। কিন্তু চক্রের কেউই তাকে আজ পর্যন্ত সরাসরি দেখেনি।

তদন্তে অচলাবস্থা ও প্রশাসনিক সহযোগিতার অভিযোগ

এ বিষয়ে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, কিডনি বিক্রি চক্রগুলোর বিরুদ্ধে পুলিশ নিয়মিত নজরদারি চালাচ্ছে। কেউ এ ধরনের চক্রের খপ্পরে পড়লে অভিযোগ করার আহ্বান জানান তিনি, সেক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, এসব চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং পুলিশের সাইবার টিম সাইবার জগতে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো অপতৎপরতা নজরে এলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

BBS cable ad

অন্যান্য এর আরও খবর: