হামে আক্রান্ত ছেলে আইসিইউতে, প্রতিবন্ধী বাবার কাঁধে বাড়ছে ঋণের বোঝা
আমি প্রতিবন্ধী মানুষ। ভ্যান চালাইয়া দিন আনি দিন খাই। ছয়জনের সংসারের ভার টানতেই জীবন শেষ। এর মধ্যে ছোট ছেলেটার একের পর এক অসুখ লেগেই থাকে। এখন আবার হাম হইছে। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় গত রোববার আইসিইউতে নিছে। এদিকে দেনা হয়ে যাচ্ছি। গত এক সপ্তাহে ৫০ হাজার টাকার বেশি দেনা হয়েছি। এ টাকা কীভাবে শোধ করব সেটা ভেবে পাচ্ছি না।
কথাগুলো বলছিলেন গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ার বাসিন্দা আসলাম।
বুধবার (২০ মে) রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের মিজেলস ওয়ার্ডের সামনে বসে আইসিইউর দিকে তাকিয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন তিনি। সেখানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে তার সাত মাস বয়সী ছেলে তাজিম।
আসলাম জানান, ছোটবেলায় মাত্র তিন বছর বয়সে বাতজ্বরে আক্রান্ত হয়ে দুই পা প্রতিবন্ধী হয়ে যাই। তারপর থেকেই কষ্ট যেন আমার জীবনের সঙ্গী। অনেক সংগ্রাম করে ভ্যান চালিয়ে চার সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে কোনোমতে সংসার চালিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ছোট ছেলে তাজিম জন্মের পর থেকেই অসুস্থতায় ভুগছে। জন্মের পর থেকে পাঁচ দিনও সুস্থ থাকে নাই। একটার পর একটা অসুখ লেগেই আছে। এখন আবার হাম হইছে।
গত সপ্তাহে জ্বর ও শরীরে র্যাশ আসার পর প্রথমে তাজিমকে গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে নেওয়া হয় গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেও দুইদিন চিকিৎসার পর চিকিৎসকরা দ্রুত ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেন। পরে গত রোববার তাকে ভর্তি করা হয় শিশু হাসপাতালের আইসিইউতে। বর্তমানে আইসিইউ’র ৯ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন আসলাম। তিনি বলেন, গতকালও ১৪ হাজার টাকা দামের একটা ইনজেকশন কিনতে হইছে। ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা মিলাইয়া গত এক সপ্তাহে প্রায় ৬০ হাজার টাকার মতো খরচ হইছে। এর মধ্যে ৫০ হাজার টাকা দুইজনের কাছ থেকে ধার করছি। আমি কোনো কাজ করতে পারি না। সামান্য একটা ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাই। এ টাকা কেমনে শোধ করুম জানি না।
তিনি বলেন, আইসিইউতে ছেলের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় ‘নরমোগ্লোবিন’ নামে একটি ইনজেকশন দিতে হয়েছে, যার দাম প্রায় ১৪ হাজার টাকা। প্রথমে বাইরে থেকে কিনতে হলেও পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি ডোজের ব্যবস্থা করে দেয়।
আসলাম বলেন, জন্মের পর থেইকা মায়ের দুধ পায় নাই তাজিম। বাইরের দুধ কিনে খাওয়াইতে হয়। এই সাত মাসেই আরও প্রায় ৫০ হাজার টাকা ঋণ করতে হইছে। এখন আবার হামের চিকিৎসার জন্য নতুন করে দেনা হইলো।
হাসপাতালের করিডোরে বসে থাকা এই বাবার চোখে তখন শুধু একটাই আকুতি ছেলেটা যেন বেঁচে যায়। আসলাম বলেন, সরকার যদি একটু সাহায্য করতো, তাহলে হয়ত ভ্যান চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালাইতে পারতাম। কিন্তু এত ঋণ শোধ করার সামর্থ্য আমার নাই।
এদিকে দেশে হামের পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাম ও উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪৮১ শিশু। একই সময়ে পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৮ হাজার ৬৭ জন এবং উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৫৭ হাজার ৮৫৬ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। এখানে হাম ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ২০৭ জন এবং আক্রান্ত হয়েছে ৩৩ হাজার ৬১৩ জন।




