স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দে এশিয়ার অন্যতম সর্বনিম্ন বাংলাদেশ
স্বাধীনতার পর স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, আয়ুষ্কাল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ বছরের বেশি। টিকাদান কর্মসূচি প্রায় শতভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে। কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবায় গড়ে উঠেছে বড়সংখ্যক দক্ষ জনবল। সীমিত সম্পদ দিয়েই এসেছে এসব সাফল্য। তবে এখনো জনসংখ্যার একটি বড় অংশ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামো থাকলেও চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও ওষুধের ঘাটতি প্রকট। আছে অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতা। সরকারি বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত।
সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যসেবায় পরিচালন ব্যয় ও বিনিয়োগে এশিয়ার স্বল্প ব্যয়ের দেশ এখনো বাংলাদেশ। সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের ৩ শতাংশের কিছু বেশি বরাদ্দ হয় এ খাতে। সেখানেও অদক্ষতা, কর্মহীনতা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। ফলে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে পরিচালন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় ১৯ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। যদিও ব্যয় হয় ১৩ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা, যা সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। তার আগের অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে পরিচালন ব্যয়ের জন্য ১৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। যদিও ১৫ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়, যা সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
এশিয়ার দেশগুলোয় স্বাস্থ্য খাতে সরকারের পরিচালন ব্যয়ের হার যে দেশগুলোয় কম তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। ফলে জনবল সংকট, চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি ও সেবার মানহীনতা থেকেই যাচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত হেলথ ইকোনমিক্স ইউনিট (এইচইউ) ২০২৩ সালের জুলাইয়ে একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘রিভিউ অব বাংলাদেশ হেলথ কেয়ার ফাইন্যান্স স্ট্র্যাটেজি ২০১২-৩২’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করে সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
স্বাস্থ্য খাতের সুদীর্ঘ অর্থনৈতিক হালচিত্র নিয়ে প্রকাশিত ওই পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সরকারি অর্থায়নের পরিমাণ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় সর্বনিম্ন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবার মোট ব্যয়ে সরকারি অংশগ্রহণ বাংলাদেশে মাত্র ৩ শতাংশ। এ হার এতটাই কম যে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের চেয়েও নিচে। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্য খাতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে মালদ্বীপ। দেশটির স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি হিস্যা ১৯ দশমিক ১৫ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে ভুটান, যেখানে এ হার ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ। আর তৃতীয় স্থানে শ্রীলংকা, যেখানে সরকারি অর্থায়নের হিস্যা ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ।
স্বাস্থ্যসেবায় দুর্বল ব্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলগুলো ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ব্যয়ের কত শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করেছে তার একটি চিত্র তুলে ধরা হয় তাতে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পুরো বিশ্বের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ের দিক থেকে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ, কেবল ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় গড়ে মোট ব্যয়ের ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশই (২০২২ সালে) স্বাস্থ্য খাতে খরচ করে। আর স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় তা গড়ে ছিল ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ (২০২০ সালে)। ঋণের দায়ে জর্জরিত গরিব দেশগুলোয় মোট সরকারি ব্যয়ের ৭ শতাংশ বরাদ্দ রাখে স্বাস্থ্য খাতে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় বহু মানুষ চিকিৎসা নিলেও সেবা সন্তোষজনক নয়। ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকটি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বাদে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের প্রতিই ঝুঁকছে মানুষ। কিন্তু সেখানেও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নানা ভোগান্তি, সঠিক রোগ নির্ণয় করতে না পারা, স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ভুল রিপোর্টের মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। সেই সঙ্গে চিকিৎসা পদ্ধতিতে রোগীকে যথেষ্ট সময় দিয়ে না দেখা, দায়িত্বে অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু, স্বাস্থ্যসেবায় অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক মনোভাব, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কম। সামর্থ্যবানরা তাই সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মতো উন্নত দেশে চিকিৎসা নিতে চলে যাচ্ছে।
চিকিৎসাসেবায় জনগণের আস্থা বাড়াতে এ খাতে দক্ষ জনবলের দরকার। পাশাপাশি গবেষণার দিকেও সরকারি নজর দিতে হবে এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নও করতে হবে। এ সবকিছুর ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও অর্থ বরাদ্দ দেয়া জরুরি।
দেশে স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় সংকট এ খাতের প্রয়োজনীয় জনবল। বিশেষ করে ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ান। এসব পদে সরকারের বিপুলসংখ্যক পদ খালি রয়েছে। এসব সংকটের কারণে পরিপূর্ণ চিকিৎসাসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেনিন চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়নি। পরিকল্পনার অভাবে বাজেট বরাদ্দ করা হয় না। বাজেটে যে পরিমাণ বরাদ্দ করা হয় তা কাজে লাগানোর মতো কাঠামোও আমাদের নেই। দেশে বিগত এক বছর জিডিপির ১ শতাংশের কম অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে। পরিকল্পনাহীনতা ও সমন্বয়হীনতার অভাবে এ ধরনের সমস্যা রয়েছে। এ অর্থটিকে কাজে লাগানোর জন্য পরিকল্পনা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সামর্থ্য তৈরি করা। বাংলাদেশের সব মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য পরিপূর্ণ পরিকল্পনা তৈরি এবং সেটিকে ধাপে ধাপে বিন্যস্ত করা হোক।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হেলথ বুলেটিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের (২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত) সংখ্যা ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৯৯। বাংলাদেশের জনসংখ্যা (১৭ কোটি ১০ লাখ) বিবেচনায় প্রতি হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক রয়েছেন দশমিক ৮৩ জন। বাংলাদেশে জনসংখ্যা ও চিকিৎসকের এ অনুপাত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
অপরদিকে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের মোট জনসংখ্যার বিপরীতে ৩ লাখ ১০ হাজার ৫০০ নার্স থাকা জরুরি, তবে আছে মাত্র ৫৬ হাজার ৭৩৪ জন। অর্থাৎ চাহিদার বিপরীতে ২৮ শতাংশ নার্স কর্মরত রয়েছে।
সরকারের দেয়া বাজেট নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আপত্তি না থাকলেও এ অর্থের পুরোটাই কাজে লাগাতে না পারার কথা জানান সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে দেয়া বাজেট আমরা কী পরিমাণ ব্যয় করতে পেরেছি, সেটির ওপর নির্ভর করে পরবর্তী বছরে বাজেট কতটা বাড়ানো হবে। আমরা সব সময় বাজেটের পুরো অংশ ব্যয় করতে পারি না। আমাদের একটি বার্ষিক পরিকল্পনা থাকে। এটি যদি জুলাইয়ের মধ্যে তৈরি করতে পারি, তাহলে আমাদের যে ক্রয় প্রক্রিয়া তা দ্রুত শুরু করা যায়। তবে এক্ষেত্রে বিলম্ব হলে পরিকল্পনা অনুযায়ী বাজেট ব্যবহার হয় না। ফলে অর্থ ফেরত যায়। বাজেট ব্যয়ের সক্ষমতা একটি বড় বিষয়।’




