শিরোনাম

Space for ads

মশার কামড়েই কি মারা যাব!

 প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১০:১০ পূর্বাহ্ন   |   চিকিৎসা

মশার কামড়েই কি মারা যাব!
Space for ads

ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশাকে বলা হতো বনেদি মশা। এরা শহরের অভিজাত এলাকাগুলোতে জন্মায়, সেই এলাকার মানুষদেরই কামড়ায়, সেই এলাকার মানুষেরাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন।

শুনেছি, তা-ও নাকি পুরুষ এডিসে কামড়ালে ডেঙ্গু হয় না, স্ত্রী এডিসে কামড়ালে হয়। এই মশা রাত জাগতে পারে না, কামড়ায় দিনের বেলায়।
জন্মের স্থানগুলো হলো—যেখানে চার-পাঁচ দিন ধরে স্বচ্ছ পানি জমে থাকে, ও রকম জায়গা। যেমন—ফ্রিজের তলার ট্রেতে, এসির তলায় জমে থাকা পানিতে, পাঁচ-সাত দিন ধরে বদলানো হয় না এমন ফুলের টবে, মানিপ্লান্টের বোতলে, গরিব এলাকার ডাবের খোসায় কিংবা গাড়ির পুরোনো পরিত্যক্ত টায়ারে।

অর্থাৎ যেখানে চার-পাঁচ দিন পরিষ্কার পানি জমে থাকে, সেই জায়গায় এই মশা জন্মায়। ভবন নির্মাণের চৌবাচ্চাও এডিস মশার একটি প্রিয়তম জায়গা।
এই মশার একটি সংক্রমিত হয়ে কোনো একজনকে কামড়ালেই তিনি ডেঙ্গু আক্রান্ত হবেন।
২০০০ সালে ঢাকায় প্রথম ব্যাপক আকারে ডেঙ্গুর আবির্ভাব ঘটেছিল।

বেশ কয়েক হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। বহু মানুষের জীবনহানি হয়েছে। ২০১৯ সালেও ডেঙ্গু বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। লাখখানেক মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল ২০২৩ সালে। প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

বছরটি ছিল ডেঙ্গু মহামারির বছর। ১৯৬৪ সালে এই দেশে প্রথম ডেঙ্গু ধরা পড়ে। রোগটিকে তখন চিহ্নিত করা হয়েছিল ‘ঢাকা ফিভার’ নামে। আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে, ১৮২৪ সালে উপমহাদেশের মধ্যে কলকাতায় প্রথম ডেঙ্গুর আবির্ভাব ঘটেছিল। ১৮৩৬, ১৮৭২ ও ১৯০৬ সালে কলকাতায় মহামারির আকার ধারণ করেছিল ডেঙ্গু। রোগটি এই উপমহাদেশে এসেছে আফ্রিকা থেকে। কলকাতায় ১৮৭২ সালে ডেঙ্গুর সময় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ১১ বছর। ডেঙ্গুর ভয়ে কলকাতা থেকে পানিহাটির এক বাগানবাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল ঠাকুর পরিবার। রবীন্দ্রনাথের আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘জীবনস্মৃতি’তে এই ঘটনার উল্লেখ আছে।

ঢাকায় ২০০০ সালে বড় আকারে ডেঙ্গুর দেখা
দেওয়ার পর সিটি করপোরেশন শুধুই ঢাকার ধানমণ্ডি, বনানী, গুলশান—এই সব এলাকা এডিসমুক্ত করার চেষ্টা করেছিল। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা কঠোরভাবে মশা নিয়ন্ত্রিত। বসুন্ধরায় আজ পর্যন্ত কখনো একজনও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায়নি। অন্য অভিজাত এলাকাগুলো আগে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হতো, পত্রপত্রিকা আর টেলিভিশনে সেই সব সংবাদ আমরা দেখেছি। দিনে দিনে এডিস মশা তার চরিত্র বদলে ফেলল। ঢাকার অভিজাত এলাকা ছেড়ে প্রথমে ছড়িয়ে গেল শহরের অন্যান্য এলাকার অলিতে-গলিতে, ছড়িয়ে গেল দেশের অন্যান্য জেলা শহরে। এমনকি উপজেলা ও গ্রামেও থাবা বসাল এডিস মশা। এখন আর তারা শুধু দিনেই কামড়ায় না, রাতেও কামড়ায়। এখন আর সংক্রমিত স্ত্রী এডিসই শুধু ডেঙ্গুর বাহক না, পুরুষ এডিসরাও ডেঙ্গুর জীবাণু বহন করে। প্রকৃতিতে এডিস মশার অনুপাত মোট মশার ১ শতাংশেরও কম। তার পরও এই মশা সংক্রমিত হয়ে কাউকে একটি কামড় বসালেই সে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হবে।

প্রথম প্রথম ডেঙ্গু ছিল শুধুই বর্ষাকালের রোগ। এখন এই রোগ বছরব্যাপীই হচ্ছে। তবে বর্ষায় ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। এ বছর এরই মধ্যে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে প্রায় সাত হাজার মানুষ। ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞরা এডিস মশার ঘনত্ব, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, সামনের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাঁরা জানিয়েছেন, ফগিংয়ে এডিস মশা নির্মূূল হয় না, ৭০ শতাংশ মশা বেঁচে থাকে।

এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
এক গোলটেবিল বৈঠকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আটটি ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথম ও প্রধান প্রতিরোধের উপায়টি বলেছেন শুধু ফগিং নয়, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। দুই. সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য সমন্বয় ও বছরজুড়ে নজরদারি জোরদার করা। তিন. উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো। চার. জনসচেতনাকে আচরণগত পরিবর্তনে রূপ দিয়ে নিয়মিত পানি জমার স্থান পরিষ্কার করা। পাঁচ. আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত র্যাপিড রেসপন্স টিম মোতায়েন ও সহজলভ্য এনএস-১ পরীক্ষা নিশ্চিত করা। ছয়. হাসপাতালগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিতে রাখা। সাত. সরকার, স্থানীয় সরকার ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা। আট. ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়ে ভুল ধারণা দূর করে জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

এই আট পরামর্শের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং জনসচেতনতা আচরণগত পরিবর্তনে রূপ দেওয়া। আমি বিশ্বাস করি, মানুষ সচেতন হলে ও সেই মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সবকিছুই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এখন এই সচেতনতার কাজগুলো কিভাবে হতে পারে? জনসচেতনতায় প্রচারমাধ্যমগুলো যদি এগিয়ে আসে, যদি টিভি চ্যানেলগুলো ডেঙ্গু প্রতিরোধে কী কী করণীয় সে বিষয়ে প্রচারণা শুরু করে, পত্রপত্রিকা তাদের প্রিন্ট ও অনলাইন ভার্সনে জনসচেতনতা শুরু করে, সোশ্যাল মিডিয়াতেও যদি মানুষ যুক্ত হয় ডেঙ্গু বিষয়ে দেশের মানুষকে সচেতন এবং কিভাবে তা প্রতিরোধ করা যায় তা জানাতে, তাহলে অবশ্যই ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব। খুব সহজ কতগুলো কাজ করলেই হয়, যেমন—মশারি টাঙিয়ে ঘুমানো, ফুলহাতা শার্ট পরা, কোথাও স্বচ্ছ পানি জমতে না দেওয়া আর মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা ইত্যাদি। শুধু সরকারের মুখ চেয়ে থাকলে হয় না, নাগরিক দায়িত্বও পালন করতে হয়। বিশেষজ্ঞরা পথ দেখিয়ে দেবেন, কাজগুলো করতে হবে আমাদেরই।

BBS cable ad

চিকিৎসা এর আরও খবর: