শিরোনাম

Space for ads

সংকটে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা

 প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ০৪:১৩ অপরাহ্ন   |   চিকিৎসা

সংকটে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা
Space for ads

রংপুর বিভাগে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল কমিউনিটি ক্লিনিক। গ্রামের দরিদ্র মানুষ জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে গর্ভকালীন সেবা, শিশু চিকিৎসা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের প্রাথমিক চিকিৎসা- সবই মিলতো বাড়ির কাছেই। কিন্তু সেই ব্যবস্থা এখন সংকটে।

ওষুধ সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার ভাঙন ও সীমিত সেবার কারণে বিভাগের দুই হাজার ৯৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যত ‘ওষুধহীন পরামর্শকেন্দ্রে’ পরিণত হয়েছে।
চার মাসের বেশি সময় ধরে অধিকাংশ ক্লিনিকে প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই। বাধ্য হয়ে উপজেলা ও জেলা শহরে ছুটতে হচ্ছে প্রান্তিক রোগীদের। এতে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়, সময় অপচয় ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গর্ভবতী নারী, শিশু, বৃদ্ধ রোগীরা।

স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে। সেইসঙ্গে বাড়বে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি। এতে দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে পড়বে। এই অবস্থায় কমিউনিটি ক্লিনিকে জরুরি ভিত্তিতে ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের আট জেলায় ২০৯৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

কমিউনিটি ক্লিনিক সংশ্লিষ্টরা জানান, শুরুতে ৩০ পদের ওষুধ দেওয়া হলেও ২০২৫ সালের শুরু থেকে ২৭ পদের ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছিল। পরে তা কমে ২২ পদে দাঁড়ায়। তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

কেন এই সংকট
স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর প্রত্যেক কমিউনিটি ক্লিনিকে তিন কার্টন করে ওষুধ এসেছিল।
এক কার্টন ওষুধ কখনও এক মাস, কখনও এক মাসের বেশি সময় ধরে রোগীদের দেওয়া হতো। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছিল। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই অনেক ক্লিনিকে ওষুধের মজুদ শেষ হয়ে যায়। কোনো কোনো ক্লিনিকে সামান্য মজুদ থাকলেও জানুয়ারিতেই তা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ২০২৬ সালে কোনো ওষুধই সরবরাহ করা হয়নি।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কেন্দ্রীয়ভাবে ওষুধ সরবরাহ না করার কারণেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

কমেছে রোগী ও সেবাগ্রহীতা
রংপুর নগরীর পূর্ব্ ঘাঘটপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রোভাইডার ইসরাত জাহান জানান, গত বছরও প্রতিদিন অন্তত ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী ও সেবাগ্রহীতা আসতেন ক্লিনিকে। সেই হিসেবে মাসে দেড় থেকে দুই হাজার রোগী আসতো। ওষুধ নাই বা দেওয়া হচ্ছে না- এমন খবরে দিনে রোগী আসে ২০ থেকে ২৫ জন।

প্রায় একই কথা বলেন, মহানগরীর ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব নাজিরদহ কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রোভাইডার রুবিনা আক্তার।

গত বুধ, বৃহস্পতি ও শনিবার রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলার অন্তত ৩০টির বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে দেখা যায়, কোথাও সুনশান নীরবতা। কোথাও রোগী থাকলেও তুলনায় কম। যারা আসছেন তারা ওষুধ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্যকর্মীরা বাধ্য হয়ে রোগীদের কাউন্সিলিং করে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ওষুধের জায়গায় লিখে রাখা হচ্ছে ‘কাউন্সিলিং’।

এখন শুধু কাউন্সিলিং হয়
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আরাজিনিয়ামত কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর ভিড় থাকলেও ওষুধের তাক প্রায় ফাঁকা। ওই উপজেলার প্রত্যেক ক্লিনিকের অবস্থা প্রায় একই।

ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আগে রোগীরা এসে ওষুধ নিয়ে যেত। এখন আমরা শুধু বুঝাই, কী খেতে হবে, কোথায় যেতে হবে। মানুষ রাগ করে, কিন্তু আমাদের হাতেও কিছু নাই।’

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বড়দরগাহ এলাকার গৃহবধূ রোজিনা বেগম বলেন, ‘আগে অনেক ওষুধ দিতো, এখন পাই না। এখন গেলে বলে শহর থেকে কিনে আনেন। গরিব মানুষ, টাকা কই?’

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অন্তঃসত্ত্বা নারী শারমিন আক্তার বলেন, ‘চারবার চেকআপ করাইছি। আয়রন ট্যাবলেট আর ক্যালসিয়াম ঠিকমতো পাই নাই। পরে প্রাইভেট ফার্মেসি থেকে কিনতে হইছে।’

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার অন্তঃসত্ত্বা নারী শারমিন আক্তার বলেন, ‘ডাক্তার আয়রন আর ক্যালসিয়াম লিখছে। ক্লিনিকে নাই। বাইরে কিনতে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা লাগছে। গরিব মানুষের জন্য এটা অনেক ‘

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আরাজি নিয়ামতপুর গ্রামের আনিচুর মিয়া বলেন, গত রাত থাকি জ্বর । ভুটকা কমিউনিটি ক্লিনিকে আসনু খালি একান কাগজ দিল। তাই খালি হাতে বাড়ি যাই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রামের দরিদ্র মানুষ একসময় কমিউনিটি ক্লিনিকের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন সেখানে গেলে চিকিৎসার বদলে শুধু পরামর্শ মিলছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে শহরের ক্লিনিক কিংবা ফার্মেসিতে যাচ্ছেন।

বাড়ছে মাতৃস্বাস্থ্য ঝুঁকি
গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই সংকট সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে গর্ভবতী নারীদের ওপর। কারণ কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোই ছিল তাদের প্রথম স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র।

স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন- আয়রন, ফলিক অ্যাসিড ও ক্যালসিয়ামের সংকটে অনেক নারী প্রয়োজনীয় পুষ্টি সহায়তা পাচ্ছেন না। এতে রক্তশূন্যতা, দুর্বলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও প্রসবজনিত জটিলতা বাড়ছে।

আরাজিনিয়ামত কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রোভাইডার মৌসুমী আক্তার বলেন, ওষুধ না থাকায় উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠাই। গ্রামের অনেক নারী হাসপাতালে যেতে চান না বা পারেন না। তারা কমিউনিটি ক্লিনিকের ওপর নির্ভর করেন। এখানে ওষুধ না থাকলে ঝুঁকি সরাসরি তাদের ওপর পড়ে।

চিকিৎসা ব্যয় বেড়েছে দরিদ্রদের
কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রামের মানুষকে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া, যাতে ছোটখাটো রোগের জন্য শহরে যেতে না হয়। কিন্তু বর্তমান ওষুধ সংকটে সেই উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

রংপুর নগরীর পূর্ব নাজিরদিগর এলাকার বাসিন্দা ফারুক মিয়া বলেন, একসময় যে রোগী বিনামূল্যে ওষুধ পেতেন, এখন তাকে শহরে যেতে হচ্ছে। ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে. অনেক ক্ষেত্রে প্রাইভেট চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। এতে করে খরচ বাড়ছে, ফলে দরিদ্র পরিবারগুলোর চিকিৎসা ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বাড়তি চাপ
কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো ওষুধ না থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ। সাধারণ রোগ নিয়েও মানুষ সেখানে ভিড় করছেন। শুধু রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে শতশত নারী-পুরুষ ও শিশু রোগী ভিড় করছে।

রংপুরের এক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে যে পরিমাণ রোগী আসতো, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি আসছে। বিশেষ করে নারী রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি।’ তিনি বলেন, ‘কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে শুনতে পাই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে হাসপাতালে চাপ বাড়ছে।’

BBS cable ad

চিকিৎসা এর আরও খবর: