সরকারি হাসপাতালে শয্যা ও ডায়ালাইসিস সেবা সংকট
খুলনা বিভাগে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে কিডনি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা।
বিশেষ করে ৪০-৬০ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। বড়দের পাশাপাশি শিশুদের মধ্যেও বাড়ছে এ রোগ। তবে আক্রান্ত রোগীর তুলনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সেবা কেন্দ্রের সংখ্যা অনেক কম বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোয় শয্যা ও ডায়ালাইসিস সেবার তীব্র সংকট রয়েছে। এতে রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
এ অঞ্চলে কিডনি রোগী বাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের কিডনি রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ আর্শাদ-উল-আজীম বলেন, ‘এ ব্যাপারে গবেষণা বা ডেটা নেই। তবে হাসপাতালে কিডনি রোগী বাড়ছে। ওয়ার্ডে জায়গা দেয়া যাচ্ছে না। বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ৪০-৬০ বছরের মানুষ। ডায়ালাইসিসেও চাপ রয়েছে।’
খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতালের কিডনি রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহকারী অধ্যাপক মো. ইনামুল কবির জানান, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ধূমপান, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ এ রোগ বাড়ার প্রধান কারণ। এছাড়া স্থূলতা, কীটনাশকযুক্ত খাদ্য ও অনুমোদনহীন ভেষজ ওষুধ সেবনের কারণেও মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগছে।
বড়দের মতো শিশু কিডনি রোগী বাড়ার বিষয়টিও এখন উদ্বেগের কারণ। খুমেকের শিশু ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দা রুখশানা পারভীন বলেন, ‘আমাদের মোট ভর্তির সাত থেকে আট শিশু কিডনি রোগী।"শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার একটি উপসর্গ হচ্ছে নেফ্রোটিক সিনড্রোম বা শরীর ফুলে যাওয়া। বংশগত কারণ, প্রস্রাবের সংক্রমণ ও জন্মগত ত্রুটির কারণেও শিশুরা কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে খুলনা অঞ্চলে শিশুদের ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা নেই। ফলে শিশুদের ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হলে বাধ্যতামূলকভাবে ঢাকায় পাঠাতে হয়।’
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিডনি আক্রান্ত রোগীদের অন্যতম প্রধান ভরসা খুমেক ও খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতাল। শুধু খুলনা বিভাগই নয়, বরিশাল ও রাজশাহী থেকেও প্রতিদিন অসংখ্য রোগী আসে এখানে।
খুমেকের ডায়ালাইসিস বিভাগের ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স নাসরিন খাতুন জানান, বিভাগে ১০টি ডায়ালাইসার মেশিনের মধ্যে একটি নষ্ট। প্রতিদিন দুই শিফটে ১৪ রোগীর ডায়ালাইসিস হয়। প্রতিবার ডায়ালাইসিসে খরচ ৪০০ টাকা। আর ছয় মাসের জন্য সপ্তাহে দুইবার ডায়ালাইসিসের এককালীন ফি ২০ হাজার টাকা।
তবে রোগীদের অভিযোগ, ডায়ালাইজার ফিল্টার, ক্যাথেটার ও ব্লাডলাইনসহ প্রয়োজনীয় মেডিকেল ইকুইপমেন্ট বাইরে থেকে কিনতে হয়। সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। শুক্রবারে ডায়ালাইসিস বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ আরো বাড়ে।
খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতালেও একই সংকট। হাসপাতালের ডায়ালাইসিস বিভাগের ইনচার্জ নাসিমা খানম জানান, ২৮টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে সচল মাত্র ১৭টি। হাসাপাতালের পরিচালক শেখ আবু শাহীন জানান, ২৪টি সাধারণ ও অন্তত ১০টি কেবিন ব্যবস্থায় কিডনি রোগীদের সেবা চলছে। অচল ডায়ালাইসার মেশিনগুলো মেরামতের চেষ্টা চলছে। অনেক ক্ষেত্রে মেরামতের পর আবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শয্যা ও ডায়ালাইসিসের সিরিয়ালের ক্ষেত্রে শতভাগ অগ্রধিকারের ভিত্তিতে করা হয়।
খুমেকের পরিচালক কাজী আইনুল ইসলাম বলেন,"‘আমি ২০২৫ সালের আগস্টে যোগদানের পর সমস্যা পর্যায়ক্রমে সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছি।’ কমিশন বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি জানান, এ বিষয়ে তার জানা নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন জানান, কিডনি রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। সরকারি সেবার পরিধি বাড়াতে খুমেকের পাশে বহুতল বিভাগীয় ক্যান্সার হাসপাতালের নির্মাণকাজ চলছে। এখানে ৪৫০টি শয্যা চালু হবে। এর মধ্যে ১৮২টি শয্যা ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য। বাকিগুলো হৃদরোগ ও কিডনি চিকিৎসার জন্য ব্যবহার হবে।




